নাগরিকত্ব নিয়ে অক্ষয় কুমারের আগের দাবি ও সাম্প্রতিক ব্যাখ্যার মধ্যে অসঙ্গতি

কানাডা সরকারের কাছে বুম যাচাই করে জেনেছে, অক্ষয় কুমার আদৌ সে দেশের সাম্মানিক নাগরিকত্ব পাননি: অথচ ভারতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বেআইনি।
নতুন দিল্লীতে ২৪ এপ্রিল ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মেদি অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে এক আলাপচারিতায়।(ছবি: এআইএনএস)

তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে তুমুল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ৩ মে অক্ষয় কুমার টুইট করেছেন—তিনি কানাডার পাশপোর্টধারী। গত ২৩ এপ্রিল তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর
সাক্ষাৎকার নেন। সাক্ষাৎকারটিকে অক্ষয় এবং মোদী উভয়েই ‘অ-রাজনৈতিক’ এবং ‘ঘরোয়া’ আখ্যা দেন। অক্ষয় শাসক দলের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ওই সাক্ষাত্কারের সূত্রেই জনমনে জল্পনা শুরু হয় যে, অক্ষয় কুমার একজন কানাডার নাগরিক।

সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।



চলতি লোকসভা নির্বাচনে তাঁর ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়। মুম্বইয়ে ভোটগ্রহণ ছিল ২৯ এপ্রিল। সেখানে মুম্বই চলচ্চিত্র জগতের সব তারকাই বুথে-বুথে হাজির হলেও অক্ষয় কুমারের গরহাজিরা কারও নজর এড়ায়নি। কানাডার কোনও নাগরিকের পক্ষে ভারতের নির্বাচনে ভোট দেওয়া বেআইনি। এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে যেমন দায়সারা ভঙ্গিতে তিনি তার জবাব দেন, তার একটা ঝলক নীচের ভিডিওটিতে দেখা যাবে।



তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে জল্পনা-কল্পনার উত্তরে প্রধানত দেশভক্তি ও জাতীয়তাবাদী আবেগ দিয়ে সিনেমা করা অক্ষয় কুমার ট্যুইটারে তাঁর কৈফিয়ত তুলে ধরেন। ট্যুইটারে এই বিবৃতিটি প্রচারের আগেই বুম তাঁর ম্যানেজারকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল, কিন্তু সেখান থেকে কোনও জবাব আসেনি। ট্যুইটারে বিরক্ত অক্ষয় বলেন, ‘তিনি বুঝতে পারছেন না কেন তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে এমন অকারণ জলঘোলা করা হচ্ছে। কারণ তিনি তো কখনও এ কথা গোপন করেননি যে, তিনি কানাডার পাশপোর্টধারী, যদিও গত ৭ বছরে তিনি একবারও কানাডায় যাননি। তিনি ভারতেই কাজ করেন, এখানে সরকারকে দেয় যাবতীয় কর দেন। এতদিন কখনও নিজের দেশের প্রতি ভালবাসা তাঁকে প্রমাণ করতে হয়নি, অথচ আজ তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে অকারণ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে’, ইত্যাদি।



কানাডার নাগরিকত্ব নিয়ে অক্ষয় কুমারের ট্য়ুইট

এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত অক্ষয় কুমারের শুক্রবারের করা এই ট্যুইট ৭২ হাজার ‘লাইক’ পেয়েছে এবং ৯৬০০টি উত্তর। তবে তাঁর এই কৈফিয়তেও নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে এ পর্যন্ত তিনি যে সব বক্তব্য পেশ করেছেন, তার সঙ্গে কোনও সঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন তাঁর টুইটের একটি অংশে লেখা—“আমি কখনও লুকোইনি বা অস্বীকার করিনি যে আমি কানাডার পাশপোর্টধারী।” তাঁর এই দাবির সঙ্গে ২০১২ সালের দ্য ভ্যানকুভার অবজার্ভার পত্রিকার একটি রিপোর্টের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না, যাতে লেখা হয়েছিল, অক্ষয় কুমার কানাডার নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন।

বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকাশ্য মঞ্চে ও বিবৃতিতে অক্ষয় কুমার এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানও ব্যক্ত করেছেন। কখনও বলেছেন ১) তিনি কানাডার সাম্মানিক নাগরিক, আবার কখনও ২) তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।

কানাডা মাত্র ৫ জনকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব দিয়েছে, অক্ষয় কুমার তাঁদের মধ্যে পড়েন না।

২০১৭ সালের অগস্টে টাইমস নাউ সংবাদ-চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অক্ষয় কুমার দাবি করেছিলেন—তিনি কানাডার সাম্মানিক নাগরিক।



তবে কানাডা এই মুহূর্ত পর্যন্ত যে ৫ জনকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব দিয়েছে, তাঁরা হলেন:
১) আগা খান, শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতা
২) মালালা ইউসুফজাই, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িনী
৩) দলাই লামা, তিব্বতি বৌদ্ধদের আধ্যাত্মিক গুরু
৪) নেলসন ম্যান্ডেলা, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং
৫) রাউল ওয়ালেনবার্গ, সুইডিশ কূটনীতিক, যিনি হোলোকাস্টের সময় ইহুদিদের পালাতে সাহায্য করেন

বুম এই ৫ জন সাম্মানিক নাগরিকের তালিকা কানাডা সরকারের কাছে পাঠালে তাঁরা সেটি সমর্থনও করেন।

কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী এবং নাগরিকত্ব দফতরের সংযোগকারী বিশ্লেষক ব্রায়ানা লেসার্ড-এর মতে, তালিকাভুক্ত এই পাঁচজনই বর্তমানে কানাডার সাম্মানিক নাগরিক l ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত মায়ানমারের আউঙ সান সু চি-ও এই সাম্মানিক নাগরিকদের তালিকায় ছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে।

এই সাম্মানিক নাগরিকত্ব সম্মান ও মর্যাদা ছাড়া কোনও বাড়তি সুযোগসুবিধা দেয় না। কানাডার অন্য নাগরিকদের মতো এঁরা কোনও সুবিধা পান না, কানাডার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কিংবা কানাডার পাশপোর্ট পাওয়ার অধিকারও তাঁদের বর্তায় না।

ন্যাশনাল পোস্ট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কানাডার সাম্মানিক নাগরিকত্ব সে দেশের পার্লামেন্টের দেওয়া একটা প্রতীকী উপাধি-- হাউস অফ কমন্স ও সেনেট যৌথভাবে যা প্রস্তাব করে-- যা কোনও বিশেষ সুযোগসুবিধা, যেমন কানাডার পাশপোর্ট পাওয়া মঞ্জুর করে না।

তাই অক্ষয় কুমারের পক্ষে এই সাম্মানিক নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।

দ্বৈত নাগরিকত্ব? ভারতে বেআইনি

ভারতীয় চলচ্চিত্রের উপর বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে ২০১০ সালের ১৫ অক্টোবর ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য ইকনমিস্ট অক্ষয় কুমারের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে, যাতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি কানাডার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তার উত্তরে অক্ষয় কুমার পত্রিকাটিকে যা বলেন, তা হল—“কানাডার সঙ্গে আমার খুব মজবুত যোগাযোগ এবং আমার দ্বৈত নাগরিকত্বও রয়েছে। এই দেশটা আমি সত্যিই খুব ভালবাসি—এর খোলা প্রশস্ত প্রান্তর, প্রাকৃতিক দৃশ্য, চওড়া রাস্তাঘাট, ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পথ, আমার নিজের দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত, যদিও সেই বিপরীত কারণেই আমি আমার স্বদেশকেও ভালবাসি, ইত্যাদি।”

২০১০ সালে প্রকাশিত দ্য ইকনমিস্ট-এর সেই লেখাটি এখানে পড়তে পারেন।
ভারতীয় আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব কিন্তু বেআইনি।
কোনও ভারতীয়ের বিদেশি পাশপোর্ট পাওয়ার বিষয়ে ১৯৫৬ সালের ভারতীয় নাগরিকত্ব বিধি (তফশিল-৩, বিধি-২) জানাচ্ছে:

কোনও ভারতীয় নাগরিক যদি একটি নির্দিষ্ট তারিখে অন্য দেশের পাশপোর্ট অর্জন করে, তবে ধরে নিতে হবে, সে অবশ্যই তার আগেই সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেছে।
অক্ষয় কুমার তাঁর উপরোক্ত টুইটে নিজেই কবুল করেছেন যে তিনি কানাডার পাশপোর্টধারী, যার অর্থ তাঁর কানাডার নাগরিকত্বও রয়েছে।

অথচ ভারতীয় সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে দ্ব্র্যর্থহীন ভাষায় লেখা আছে, কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করে থাকেন, তাহলে সংবিধানের ৫ নম্বর, ৬ নম্বর ও ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য হবেন না।
ভারতীয় সংবিধান পড়ে দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

Show Full Article
Next Story