Connect with us

১৯৮৮ সালে কী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে ডিজিটাল ক্যামেরা ও ই-মেল পরিষেবা ব্যবহার করা সম্ভব ছিল?

১৯৮৮ সালে কী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে ডিজিটাল ক্যামেরা ও ই-মেল পরিষেবা ব্যবহার করা সম্ভব ছিল?

বুম দেখেছে, ৯০-এর দশকের আগে ইন্টারনেট কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরা, কোনওটাই এ দেশে জনসাধারণের কাছে লভ্য ছিল না।

৮০-র দশকের শেষ দিকে তিনি ডিজিটাল ক্যামেরা ও ই-মেল পরিষেবা ব্যবহার করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি যে দাবি করেছেন, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরাট বিতর্ক শুরু হয়েছে।
২০১৯ সালের ১১ মে নিউজ নেশন টিভি চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মোদী দাবি করেন, তিনিই সম্ভবত এ দেশে সর্বপ্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা ও ই-মেল পরিষেবা ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ১৯৮৭-৮৮ সালে গুজরাটের বিরামগামে তিনি লালকৃষ্ণ আডবাণীর একটি ছবি ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলেন এবং ছবিটি ই-মেল মারফত দিল্লিতে পাঠিয়ে দেন। তাঁর কথায়, “পরদিনই আডবাণীকে অবাক করে দিয়ে সংবাদপত্রে সেই ছবিটি পুরোপুরি রঙিন হয়ে ছাপা হয়।”

নিউজ নেশানকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎকার। ৫৯:০০ সময়ে প্রশ্ন করার ওই প্রসঙ্গটি পাওয়া যাবে।

একটি সোশ্যাল মিডিয়া ঝড়

মোদীর এই মন্তব্য তীব্রভাবে সমালোচিত হয় এই কারণে যে, ৯০-এর দশকের আগে ভারতে ডিজিটাল ক্যামেরা কিংবা ইন্টারনেট পরিষেবা কোনওটাই লভ্য ছিল না।

অন্য কেউ-কেউ অবশ্য দাবি করতে থাকেন, এর অনেক আগেই ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা এবং ইন্টারনেট মারফত মেল পাঠানোর প্রযুক্তি নাগালে এসে গিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী মিথ্যা দাবি করছেন, এই বিতর্কের মধ্যেই বুম বিষয়টির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
মোদীর বক্তব্য থেকে দুটি প্রধান প্রশ্ন উঠে আসে:
১) ১৯৮৮-৮৯ সালের মধ্যে কি মোদীর হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহারের প্রযুক্তি এসে গিয়েছিল?
২) ই-মেল পরিষেবা ব্যবহার করে তাঁর পক্ষে কি সে সময় বিরামগাম থেকে দিল্লিতে কোনও মেল পাঠানো সম্ভব ছিল?

প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা

নিউইয়র্ক টাইমস-এর একটি ব্লগ অনুসারে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরাটি তৈরি হয় ১৯৭৫ সালে, ইস্টম্যান কোডাকের কর্মচারী ২৫ বছর বয়স্ক স্টিভেন স্যাসন-এর হাতে। তবে ছবির গুণমান খুব খারাপ হওয়ায় এই ক্যামেরাটি বাণিজ্যিকভাবে কখনওই জনসাধারণের সামনে আনা হয়নি। অবশ্য ১১০ রঙিন নেগেটিভ সে সময়ে ব্যবহৃত হতো।

১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্যাশনের নির্মিত প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা, বর্তমানে যা প্রদর্শিত হয় স্মিথশোনেনিয়ান ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ আমেরিকান হিস্ট্রিতে। সূত্র: ফ্লিকার

১৯৮১ সালে সোনি কোম্পানি প্রথম ফিল্ম ছাড়া ক্যামেরা বাজারে আনে। নাম প্রো-মাভিকা, যেটি ১৯৮৮ সালে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য বাজারে ছাড়া হয়। তবে মাভিকা ছিল অ্যানালগ ক্যামেরা (২ ইঞ্চির ফ্লপি ডিস্কে যা ছবিগুলি ধরে রাখত), কোডাকের মতো ডিজিটাল ক্যামেরা নয়।
তন্ন-তন্ন করে খুঁজে বুম দেখেছে, মাত্র দুটি ক্যামেরা সাধারণের ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল ক্যামেরা হিসাবে প্রথম বাজারে বেরিয়েছিল— ফুজি-ডিএস x এবং কোডাক-ডিসিএস-১০০।
৭০-এর দশক থেকেই ফুজি তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিল, যার পরিণতিতে ১৯৮৮ সালে প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরার প্রোটোটাইপ মডেল ডিএস-১পি তৈরি হয়, তবে সেটি বাজারে ছাড়া হয়নি।
এর ঠিক এক বছর পর ফুজি তার পুরোপুরি ডিজিটাল ক্যামেরা উন্নততর ডিএস-x বাজারে আনে ১৯৮৯-র ডিসেম্বরে, যেটির দাম ছিল ২০ হাজার ডলার বা ১৪ লাখ টাকা (মুদ্রাস্ফীতি হিশেবে রাখলে আজ যার দাম হবে ২৮ লাখ)। একই বছরে কোডাকও তার উন্নততর ডিজিটাল ক্যামেরা বানিয়ে ফেলে, যার রেসলিউশন ছিল ১০ লক্ষ পিক্সেলের বেশি। কোডাকের এই নতুন মডেল ডিসিএস-১০০ বাণিজ্যিকভাবে সুলভ হয় ১৯৯১ সালে, অন্তত Mashable– এর প্রতিবেদনে সে কথা জানা যায়।

প্রথম প্রোটোটাইপটি ১৯৮৬ সালে তৈরি হয় এবং সেটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার উপযোগী হয় ১৯৯১ সালে। কোডাকের এই ডিএসসি-১০০কেই প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরার মান্যতা দেওয়া হয়। তবে প্রথম দিকে ধনী সংবাদসংস্থার অবস্থাপন্ন আলোকচিত্রীরাই ১০ থেকে ২০ হাজার ডলার মূল্যের এই ক্যামেরা কিনতে পারত, যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধ ‘কভার’ করতে যাওয়া সাংবাদিককুল, যাঁদের প্রায় সারাক্ষণই ১১ পাউন্ডের বোঝা বয়ে বেড়াতে হতো।

উৎস: Mashable

সুতরাং ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের আগে নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে কোনও ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করা সম্ভব নয়, অবশ্য যদি না সে সময় তিনি ১৪ লাখ টাকায় (এখনকার দামে ২৮ লাখে) সেটি কিনে থাকেন।
তাই ১৯৮৮ সালে ডিজিটাল ক্যামেরায় তাঁর আডবাণীর ছবি তোলার দাবিটি খুব সঠিক বলে মনে করা কঠিন।

এর পর এল ইন্টারনেট

নিউজ নেশনকে মোদী জানান—“সে সময় (১৯৮৭-৮৮ সালে) খুব কম লোকই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারত। আমি ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে আডবাণীর একটি ছবি তুলি এবং সেটা তত্ক্ষণাত দিল্লিতে পাঠিয়ে দিই।”
বুম বিজেপির তথ্য-প্রযুক্তি সেল-এর ভারপ্রাপ্ত অমিত মালব্যকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেও সেখান থেকে কোনও জবাব আসেনি। জবাব পাওয়ামাত্র প্রতিবেদনটি পরিমার্জন করা হবে।

অতঃপর, বুম যদি ধরে নেয় যে, প্রধানমন্ত্রী যে ই-মেল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা নিশ্চয় কোনও বৈদ্যুতিন মেল পরিষেবা, যা ব্যবহার করে তিনি তাঁর তোলা আডবাণীর ছবিটি পাঠিয়েছিলেন।
প্রসঙ্গত, ই-মেল পরিষেবা এ দেশে ১৯৬০-এর দশক থেকেই পাওয়া যেত, তবে সেটা এখনকার ইন্টারনেটের মতো নয়, সীমিত সংখ্যক কম্পিউটারের মধ্যেই তার চালাচালি চলত। ভারতে প্রথম ইন্টারনেট পরিষেবা লভ্য হয় ১৯৮৬ সালে শিক্ষা ও গবেষণা নেটওয়ার্ক (ইআরনেট) চালু হওয়ার পর।
দেশের ৮টি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর সফ্টওয়্যার টেকনোলজি, আইআইএসসি ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি, মুম্বই, কানপুর, খড়্গপুর ও মাদ্রাজের আইআইটি এবং নয়াদিল্লির ডিপার্টমেন্ট অফ ইলেক্ট্রনিক্স রাষ্ট্রপুঞ্জের ইউএনডিপি-র সহায়তায় এই অন্তর্জালে সংযুক্ত হয়।
২০১৫ সালের ১৪ অগস্ট ইআরনেট-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্রীনিবাসন রামানির একটি বইয়ের অংশবিশেষ প্রকাশ করে নিউজ-১৮ , যাতে বৈদ্যুতিন মেল-পরিষেবা ও ইন্টারনেট বিষয়ে বিষদ তথ্য রয়েছে।

বুম রামানির কাছে এ বিষয়ে আরও বিশদ তথ্য জানতে চেয়েছে। তাঁর প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেই প্রতিবেদনটি পরিমার্জন করা হবে।
১৯৮৮ সালেই যদিও ই-মেল পরিষেবা এ দেশে লভ্য হয়, তা সত্ত্বেও ১৯৯৫ সালে ভিএসএনএল ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার আগে পর্যন্ত ই-মেল পরিষেবা কেবল উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। কেবল ১৯৯৫ সালের পরেই ইন্টারনেট সর্বসাধারণের নাগালে এসে যাওয়ার পর ই-মেলে একজন অন্যজনকে বার্তা বা ছবি পাঠানোর সুযোগ ব্যবহার করতে পারে।
তাই ১৯৮৮ সালে নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে কাউকে ই-মেল পাঠানো বোধহয় সম্ভব ছিল না, যেমনটা নাকি তিনি দাবি করেছেন।

সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর করা বেশ কিছু অবাস্তব দাবির বাইট সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
যেমন এর আগে একবার তিনি বলেন যে, বালাকোটে বিমান-হানার দিনক্ষণ স্থির করার সময় তিনি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার ওপর জোর দিয়েছিলেন, কেননা সে ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের রাডারে ভারতীয় বিমানের গতিবিধি ধরা পড়বে না!

এই দাবির সঙ্গে তাঁর ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করার দাবি মিলে টুইটারে ১২ ও ১৩ মে তারিখে #ক্লাউডিমোদি ও #গ্যাজেটগোবি নিয়ে ট্রেন্ডিং শুরু হয়।

লোকসভা নির্বাচনের সপ্তম ও অন্তিম দফা আগামী ১৯ মে শুরু হচ্ছে এবং ২৩ মে ভোটগণনা ও ফলপ্রকাশের জন্য ধার্য হয়েছে।

(বুম হাজির এখন বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে। উৎকর্ষ মানের যাচাই করা খবরের জন্য, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের টেলিগ্রাম এবং হোয়াটস্‍অ্যাপ চ্যানেল। আপনি আমাদের ফলো করতে পারেনট্যুইটার এবং ফেসবুকে|)


Continue Reading

Archis is a fact-checker and reporter at BOOM. He has previously worked as a journalist for broadsheet newspapers and in communications for a social start-up incubator. He has a Bachelor's Degree in Political Science from Sciences Po Paris and a Master's in Media and Political Communication from the University of Amsterdam.

Click to comment

Leave a Reply

Your e-mail address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

Recommended For You

To Top