ভারতীয় নেতাদের সুইস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁস— দাবি করা নথিটি ভুয়ো

বুম দেখে চিঠিটি লেখা হয় সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশনের লেটারহেডে। কিন্তু ২০১১ সালে সে রকম কোনও ব্যাঙ্কের অস্তিত্বই ছিল না।

দাবি করা হচ্ছে সুইস ব্যাঙ্কে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের কত টাকা আছে তা নাকি ফাঁস করে দিয়েছে একটি নথি—কিন্তু সেটি ভুয়ো।

সেটি নাকি বন্ধ হয়ে যাওয়া সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশনের একটি চিঠি। এবং ২০১১ সাল থেকে সেটি অনলাইন আছে।

আইএনএক্স মিডিয়া কেসে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের ভূমিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, ওই নথিটিকে আবার জাগিয়ে তোলা হয়েছে।

১৯৯৭ সালে সুইস ব্যাঙ্ক করপোরেশন ও ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ সুইজারল্যান্ড মিশে গিয়ে তৈরি হয় লগ্নিপ্রদানকারী ব্যাঙ্ক ইউবিএস। ইউবিএসও বুমকে জানিয়েছে যে, ওই নথিটি ভুয়ো।

নীচের ছবি সহ বার্তাটি যাচাই করার জন্য বুমের হেল্পলাইনে (৭৭০০৯০৬১১১) পাঠানো হয়েছিল।

বুমের হেল্পলাইনে পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাটি।

দীর্ঘ প্রতারণা

ওই জাল নথি তৈরি করা হয় সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোশনের লেটারহেডে। এবং সেটির তারিখ, ৩১ অক্টোবর ২০১১।

অদ্ভূত ব্যাপার হল, ওই চিঠিটি পাঠানো হয়েছে, ‘ভারতীয় সরকার, ভারত’, এই ঠিকানায়। অথচ সেটি পাঠানো উচিত ছিল ভারতের অর্থমন্ত্রকে। অথবা ওই মন্ত্রকে কোনও ব্যক্তির কাছে। নথিটি সই করেছেন মার্টিন ডে সা পিন্টো নামের কোনও এক ব্যক্তি, যিনি নাকি ওই ব্যাঙ্কের ম্যানেজার।

চিঠিটিতে বলা হয়েছে, “সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশন (সুইজারল্যান্ড) আপনাদের একটা সুনির্দিষ্ট নোট পাঠাচ্ছে। তাতে ভারতের ১০ প্রথমসারির ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য রয়েছে। তার মধ্যে বড় অঙ্কের আমানতেরও হিসেব রয়েছে। তাঁদের সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সেই সঙ্গে আইটি রিটার্ন, ব্যবসার চরিত্র, এবং ব্যবসার ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখুন। তাঁদের ব্যবসার বিস্তারিত তথ্য আমাদের কাছে ৩১ মার্চ ২০১২’র মধ্যে পাঠানো।”

তারপর, ওই চিঠিতে ভারতীয় নেতাদের তথাকথিত অ্যাকাউন্টের হিসেব দেওয়া হয়। সেই নেতাদের মধ্যে রয়েছেন রাজীব গান্ধী, আন্দিমুথু রাজা, হর্শদ মেহতা, শরদ পাওয়ার, পি চিদাম্বরম, সুরেশ কালমাডি, মুথুভেল করুণানিধি, কেতন পারেখ, চিরাগ জয়েশ মোহিনী এবং কালানিধি মারান।

চিঠিটিতে আরও বলা হয়, “আমাদের সিস্টেমে, এই ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টগুলি ব্লক করা আছে। যদি ৩১ মার্চ ২০১২’র মধ্যে আমাদের ব্যাঙ্কে টাকা রাখার বিষয়ে স্বচ্ছ বিবরণ না পাওয়া যায়, তাহলে অ্যাকাউন্টগুলি তামাদি হয়ে যাবে।”

তথ্য যাচাই

সুইস ব্যাংক কর্পোরেশন ১৯৯৮ থেকে বন্ধ

চিঠিটা যে ভুয়ো তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সেটা সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশনের নামে লেখা হয়েছে ২০১১ সালে।

ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে, সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশন আর ইউনিওন ব্যাঙ্ক অফ সুইজারল্যান্ড একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি হয় ইউএসবি। গুগুলে ‘সুইস ব্যাঙ্ক করপোরেশন’ সার্চ করলে দেখা যায় যে, ১৯৯৮ সাল থেকেই তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই।

দুই ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণের ওপর ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর একটি প্রতিবেদনেরও সন্ধান পায় বুম। নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়, “দুই বৃহৎ ব্যাঙ্ক—ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ সুইজারল্যান্ড ও সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশন—আজ তাদের সংযুক্তিকরণ ও সেই ভাবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাঙ্ক তৈরি করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।”

রিপোর্টে আরও বলা হয়, “ওই মিলিত ব্যাঙ্কের নাম হবে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ সুইজারল্যান্ড। তার ব্যবসায়িক ও ক্রেতা সংক্রান্ত কাজের প্রধান কার্যালয় হবে জুরিখ। আর ব্যক্তিগত ব্যঙ্কিং কাজের প্রধান কার্যালয় হবে ব্যাসেল।”

নথি জাল, বলছে ইউবিএস

নথিটির সত্যতা যাচাই করার জন্য বুম ইউবিএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে।

“এটা পরিষ্কার যে চিঠিটা জাল। কারণ, অক্টোবর ২০১১ সালে সুইস ব্যাঙ্ক কর্পোরেশনের কোনও অস্তিত্বই ছিল না,” ইউবিএস-এর জনসংযোগ বিভাগের মার্ক পান্ডে ইমেল মারফৎ জানান বুমকে।

পুরনো ভুয়ো নথি ফিরে এল

অনলাইনে ওই চিঠিটি সার্চ করলে দেখা যায় সেটি সোশাল মিডিয়ায় রয়েছে ২০১১ সাল থেকে।

কোরা ব্যবহারকারীরা চিঠিটিকে জাল বলে ঘোষণা করেন ২০১৬ সালে। (সে সম্পর্কে এখানে পড়ুন)

ভুলে ভরা

চিঠিটির ভাষা ভুলে ভরা। তাতে সংখ্যা বোঝাতে ভারতীয় কোটি ব্যবহার করা হয়েছে, যখন ইউরোপীয়রা ব্যবহার করে মিলিয়ন এবং বিলিয়ন।

রহস্যময় ‘ম্যানেজার’ মার্টিন ডি সা’পিন্টো একজন সাংবাদিক

মার্টিন ডি সা’পিন্টো হলেন রয়টার্সের প্রাক্তন ব্যবসা-বানিজ্য বিষয়ক সাংবাদিক। সুইজারল্যান্ড থেকে কাজ করতেন। তার ‘লিঙ্কডইন’ প্রোফাইল থেকে জানা যায় যে, উনি এখন আর্থিক তদন্ত ও ব্যবসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

আমরা গুগুলে তার নাম এবং সুইস ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তার প্রতিবেদনগুলি সার্চ করি।

Claim Review :  নথি দেখায় ভারতীয় নেতাদের সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের বিষয়ে
Claimed By :  FACEBOOK POSTS
Fact Check :  FALSE
Show Full Article
Next Story