বাংলাদেশে হিংসায় আহত মহিলা মিথ্যে দাবিতে ছড়াল ভিন্ন ঘটনার ছবি

বুম দেখে ২০২০ সালের ছবিটি পরিবারটির উপর এক জমি মাফিয়ার আক্রমণের ঘটনা।

অন্য ঘটনায় আহত হওয়া মহিলার (injured woman) মর্মান্তিক ছবি সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করে গত গত সপ্তাহের বাংলাদেশের (Bangladesh Violence) সাম্প্রদায়িক হিংসা (Communal Violence) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মিথ্যে দাবি করা হয়েছে।

ছবিটি ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশের নোয়াখালিতে একটি হিন্দু গ্রামের উপর মুসলমান আক্রমণের ঘটনার বলে দাবি করা হয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে যে, ওই অঞ্চলে এক গর্ভবতী মহিলাকে মুসলমান দুষ্কৃতীরা গণধর্ষণ করে, এবং তাঁর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

বুম অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ছবিটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হিংসার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ছবিটি আসলে ২০২০ সালের একটি ঘটনা।

দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই ছবিটি ভাইরাল হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় এক হিন্দু দেবমূর্তির হাঁটুতে কোরান রাখার একটি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পরই এই দাঙ্গা শুরু হয়। হিংসা ছড়ানো রুখতে গত সপ্তাহে বেশ কিছু জায়গায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দু নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন, এবং কঠোর পদক্ষেপ করার আশ্বাস দেন।

ভাইরাল হওয়া ছবিটিতে দাবি করা হয়েছে যে, এক গর্ভবতী মহিলাকে গণধর্ষণ করা হয় এবং তার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ছবিটির সঙ্গে ইংরেজি এবং বাংলাতে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে।

ছবিটির সঙ্গে ইংরেজিতে লেখা ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, "আজ ২২ অক্টবর শুক্রবার সন্ধে হওয়ার পরই নোয়াখালিতে একদল মুসলমান লুঠপাট ও আগুন ধরাতে শুরু করে। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ একদল উত্তজিত জেহাদি মুসলমান একটি হিন্দু গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং এক হিন্দু গর্ভবতী মহিলাকে ধর্ষণ করে ও গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। সঙ্গে আর দুজনকে হত্যা করে। পরিস্থিতি খুব খারাপ এবং ভয়ংকর। প্রায় ৩০টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রশাসনের কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। যে সব হিন্দু দেশের বাইরে থাকেন, আমি তাঁদের কাছে এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে তুলে ধরার জন্য অনুরোধ করছি। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। ভারতের একশো ত্রিশ কোটি হিন্দু নাগরিকের কাছে আমদের প্রার্থনা , দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। জেগে ওঠো, সনাতনী, জেগে ওঠো।"


তথ্য যাচাই

বুম ভাইরাল হওয়া ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ করে এবং বাংলাদেশি নিউজ আউটলেট দেশ ১-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন দেখতে পায়। ওই প্রতিবেদনটি ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের মংলা সাব ডিভিশনে জোর করে জমি দখলের চেষ্টায় এক হিন্দু পরিবারের উপর আক্রমণ করা হয়। ওই ঘটনায় এক গর্ভবতী মহিলা সহ পরিবারের সাতজন আহত হন।


এই সূত্র ধরে আমরা আরও কিওয়ার্ড সার্চ করি এবং এই ঘটনার উপর বাঘেরহাট ২৪-এর একটি স্থানীয় প্রতিবেদন দেখতে পাই এবং সেখানে ভাইরাল ছবিটিও দেখতে পাই। ঐ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বাঁশতলা গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি আহ সালাম চিলা ইউনিয়নের গোলাদাংরা গ্রামের এক সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের জমি দখল করার চেষ্টা করে। জমি দখল করার জন্য ওই ব্যক্তি তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে ষড়যন্ত্র করছিল।

ঐ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ২০২০ সালের ২৪ এপ্রিল আহ সালাম এবং তার গুন্ডারা কিছু ঘরোয়া অস্ত্র নিয়ে অনিল বালার পরিবারের উপর আক্রমণ করে। গর্ভবতী গৃহবধূ সুমিতা বালা, অনিল বালা, মায়া বালা, সরলা গোলদার, পুটু গোলদার ও শঙ্কর গোলদার নামে দুই শিশু সহ মোট আট জন এই ঘটনায় আহত হন।

ভাইরাল ছবিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বুম বাংলাদেশ বাঘেরহাট ২৪'র সাংবাদিক মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করে। রানা আমাদের জানান যে, তিনিই ওই ঘটনার রিপোর্ট করেছিলেন। ছবিতে যে মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, মাসুদ তাঁকে সুমিতা বালা বলে চিহ্নিত করেন। জানান যে, ২০২০ সালে সুমিতা বালাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় এই ছবিটি তোলা হয়েছিল।

তা ছাড়াও, ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর নোয়াখালিতে হিন্দুদের উপর মুসলমানদের আক্রমণের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন বুম খুঁজে পায়নি। সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে ১৫ এবং ১৬ অক্টোবর নোয়াখালির চোউমহনিতে মন্দিরে আক্রমণের ঘটনায় দু'জনের মৃত্যু হয়। দ্য ঢাকা ট্রিবিউন উল্লেখ করে, "নোয়াখালির বেগমগঞ্জ উপজেলার চোউমহনির বাজার অঞ্চলে আক্রমণে জড়িত থাকায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে। শনিবার এস পি শহিদুল্লা একটি প্রেস ব্রিফিংএ জানান যে, এই ঘটনায় মোট ১০টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।"

বুম বাংলাদেশ নোয়াখালি জেলার এসপি-র সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ সুপার মহম্মদ শহিদুল্লা ইসলাম বুম বাংলাদেশকে জানান, "ছবিতে যা বলা হয়েছে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন। ওই অঞ্চলে ২২ অক্টোবর কোনও হিন্দু মহিলাকে ধর্ষণ বা খুনের ঘটনা ঘটেনি। ১৫ অক্টোবরের পর নোয়াখালিতে আর কোনও সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেনি।

ইসলাম আরও জানান, "যারা সোশাল মিডিয়ায় গুজব ছড়াচ্ছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করব।"

(অতিরিক্ত রিপোর্টিং, বুম বাংলাদেশ)

আরও পড়ুন: ত্রিশূল হাতে প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরার ছবিটি নকল, কারিকুরি করা

Updated On: 2021-10-26T13:05:58+05:30
Claim :   ছবি দেখায় নোয়াখালি বাংলাদেশে এক গর্ভবতী মহিলাকে গণধর্ষণের পর গলা টিপে খুন করার দৃশ্য
Claimed By :  Facebook Posts
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story
Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors.
Please consider supporting us by disabling your ad blocker. Please reload after ad blocker is disabled.