কলকাতার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ, কার নামে হয়েছিল রাস্তার নামকরণ?
বুম ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখে, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার অনেক আগেই ১৯৩৩ সালে সুরাবর্দী অ্যাভিনিউর নামকরণ করা হয়েছিল। কলকাতার ভয়াবহ সেই দাঙ্গা হোসেন শহীদ সুরাবর্দীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে।

কলকাতা পৌরসভা (KMC) গোপাল মুখার্জী রোড নামকরণের অনুমোদন দেওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে কলকাতার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউয়ের (Suhrawardy Avenue) ইতিহাস। ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গায় গোপাল পাঁঠা নামে পরিচিত বাঙালি মাংস ব্যবসায়ী গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা প্রশংসিত দক্ষিণপন্থী-হিন্দু মহলে; বস্তুতঃ সেই কথা মাথায় রেখেই করা হয় এই নাম-পরিবর্তন।
কলকাতা পৌরসভার ওই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নব-নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২১ জুন লেখেন, "কয়েক দশক ধরে আমাদের শহরের একটি প্রধান সড়ক এমন একজনের নাম বহন করেছে, যিনি নিছক রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে নিরপরাধ নাগরিকদের গণহত্যার আয়োজন করে ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে এক মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।"
যদিও মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে কারোর নাম উল্লেখ করেননি, তবে অনেকেই তার মন্তব্যকে হুসেন শহীদ সুরাবর্দীর প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে মনে করেছেন। 'বাংলার কসাই' হিসেবে কুখ্যাত হুসেন সুরাবর্দীর নাম ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার সাথে জড়িয়ে রয়েছে।
ওই পোস্টেই গোপাল মুখার্জীকে মুখ্যমন্ত্রী ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় "হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণ রক্ষাকারী প্রধান রক্ষক" বলে উল্লেখ করেন।
তবে ঐতিহাসিক নথিতে থাকা তথ্য ও গবেষকদের মত অনুযায়ী, সুরাবর্দী অ্যাভিনিউর নামকরণ আদৌ হুসেন শহীদ সুরাবর্দীর নামে হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডের জন্য হুসেন সুরাবর্দীকেই মূলতঃ দায়ী করা হয়।
কী পেলাম আমরা অনুসন্ধানে: 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' নামের পিছনকার ইতিহাস
বুম প্রথমে উপলব্ধ সরকারি রেকর্ড ঘেঁটে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একাধিক নথি খুঁজে পায়, যেখানে রাস্তাটির নাম শুধু 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। কলকাতা পৌরসভার প্রকাশিত একটি মানচিত্রও তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে কোনও নথিতেই সুরাবর্দীর পূর্ণ নাম উল্লেখ না থাকায়, রাস্তার নামটি ঠিক কোন সুরাবর্দীর নামে রাখা হয়েছিল, তা সুস্পষ্ট নয়।
কলকাতা পৌরসভার নথিতে রাস্তাটিকে 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে
কলকাতার রাস্তার ইতিহাস সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে আমরা ইতিহাসবিদ পি. থাঙ্কাপ্পান নায়ারের লেখা 'আ হিস্ট্রি অফ ক্যালকাটা'স স্ট্রিটস' বইটি খুঁজে পাই। বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের ৮৬৬ নম্বর পাতায় সুরাবর্দী অ্যাভিনিউয়ের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার হাসান সুরাবর্দীর নামে।
নায়ার লিখছেন, "কর্পোরেশন ১৯৩৩ সালের ৮ মার্চ, বুধবার অনুষ্ঠিত সভায় পার্ক সার্কাস থেকে কসাইপাড়া লেনের সংযোগস্থলে নির্মিত নতুন (১০০ ফুট) রাস্তার নাম 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। রাস্তার উত্তর দিকে স্যার হাসান সুরাবর্দীর বাড়ি অবস্থিত ছিল।"
লেখক প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, রাস্তার নামকরণের সিদ্ধান্তের উল্লেখ কলকাতা পৌর গেজেটের ১৭ নম্বর খণ্ডের ১০৩০ নম্বর পাতায়ও পাওয়া যায়।
কলকাতা পৌর গেজেট, ১৭তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৩০। সূত্র: গুগল বুকস
কলকাতার 'খালি পায়ের ইতিহাসবিদ' হিসেবে পরিচিত পি টি নায়ারের বইটি তৎকালীন কলকাতা পৌরসভার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয়। একই সাথে বইটিতে একটি ডিসক্লেমারও দেওয়া হয়, যেখানে বলা রয়েছে, লেখকের উপস্থাপিত তথ্য, মতামত বা উপসংহারের জন্য কর্পোরেশন দায়ী নয়।
এছাড়াও ইতিহাসের পাতা ঘাঁটতে বুম কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারেও পৌঁছে যায়। সেখানে অজিত কুমার বসুর লেখা 'কলিকাতার রাজপথ: সমাজে ও সংস্কৃতিতে' বইটি পাওয়া যায়, যেখানে কলকাতার রাস্তাগুলির ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বসু কলকাতা পৌরসভায় একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কলকাতার রাস্তার নামের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এবং বিরল ঐতিহাসিক নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতেই বইটি তিনি লেখেন।
বসুর লেখা বইয়ের ২০৮ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী, তৎকালীন কাউন্সিলর শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালের ৮ মার্চ কলকাতা পৌরসভার সভায় নব-নির্মিত রাস্তার নাম 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' রাখার প্রস্তাব দেন।
লেখকের বয়ান অনুযায়ী, শৈলেন্দ্রনাথ বলেন, "স্থানীয় জনগণের ঐক্যমতের ইচ্ছার প্রতি সম্মান এবং বিশিষ্ট মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সুরাবর্দীর বিশাল বিদ্যা,পাণ্ডিত্য, গভীর ধর্মভীরুতা ও পবিত্র চরিত্রের স্বীকৃতিস্বরূপ" প্রস্তাবটি করা হয়েছিল।
মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সুরাবর্দী ছিলেন স্যার হাসান সুরাবর্দীর পিতা এবং বাংলার একজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত।
বসু আরও লেখেন, কর্পোরেশন একই দিন প্রস্তাবটি অনুমোদন করে এবং রাস্তার নাম স্যার হাসান সুরাবর্দীর পিতা মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সুরাবর্দীর নামেই রাখা হয়।
সুরাবর্দী অ্যাভিনিউর নামকরণ মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সুরাবর্দীর নামে, মত ইতিহাসবিদদের
স্বাধীন ইতিহাস গবেষক ড. সৌম্য বসু বুমকে জানান, রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল মৌলানা উবায়দুল্লাহ সুরাবর্দীর নামে, তার পুত্র স্যার হাসান সুরাবর্দীর নামে নয়। কারণ, নামকরণের সময় স্যার হাসান তখনও জীবিত ছিলেন। তিনি বলেন, "যখন রাস্তার নাম 'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ' রাখা হয়, স্যার হাসান সুরাবর্দী তখনও জীবিত ছিলেন। যদিও এবিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবে ঐতিহাসিক নথি ঘাঁটলে বোঝা যায়, সেসময় জীবিত ব্যক্তির নামে রাস্তার নামকরণ করা সাধারণ রীতি ছিল না।"
প্রাক্তন সরকারি কলেজের অধ্যাপক রত্না সেনগুপ্তও বলেন, কলকাতা পৌর গেজেটের কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই অ্যাভিনিউটির নাম স্যার হাসান সুরাবর্দীর নামে রাখা হয়েছিল। তার মতে, রাস্তার পাশে সুরাবর্দী পরিবারের বাড়ি থাকা মাত্রই সেটিকে হাসান সুরাবর্দীর নামে নামকরণের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।
রত্না জানান, "পৌর নথি অনুযায়ী, রাস্তার নামকরণ হয় ১৯৩২ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে। তখনও হুসেন শহীদ সুরাবর্দী তার রাজনৈতিক প্রভাবের শীর্ষে পৌঁছাননি। হুসেন সুরাবর্দীর বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীত্বকাল আসে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে।"
তিনি আরও বলেন, "রাস্তার নামটি সুরাবর্দী পরিবারের কোন সদস্যের নামে রাখা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলা যায়, এমন কোনও প্রত্যক্ষ নথি নেই। তাই উপলব্ধ পারিপার্শ্বিক প্রমাণের উপরেই নির্ভর করতে হবে। সেই প্রমাণের ভিত্তিতে সবচেয়ে সম্ভাব্য ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হল, অজিত কুমার বসুর মত অনুযায়ী সুরাবর্দী অ্যাভিনিউর নামকরণ হয়েছিল মৌলানা ওবায়দুল্লাহ সুরাবর্দীর নামে।"






