কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ভারত সরকারের স্তুতিতে এক মার্কিন সিইওর আঁকা ম্যাপ?

সোশাল মিডিয়ায় মানচিত্রটিকে সাম্প্রতিক বলে দাবি করা হলেও বুম দেখেছে মানচিত্রটি ২০১৬ সাল থেকেই ইন্টারনেটে আছে।

সোশাল মিডিয়ায় ভারতের মানচিত্রের একটি ছবি শেয়ার করা হচ্ছে, যেখানে ভারতের প্রতিটি রাজ্যকে জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই মানচিত্রকে সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করে বলা হচ্ছে একজন মার্কিনী সিইও এটি বানিয়েছেন, এবং তিনি এই মানচিত্র দিয়ে বোঝাতে চেয়ছেন কীভাবে ভারত তার বিপুল জনসংখ্যা নিয়েও অনেক দেশের চেয়েও ভালভাবে কোভিড-১৯ সংকটের মোকাবিলা করছে।

বুম দেখেছে দাবিটি একাধারে ভুয়ো এবং বিভ্রান্তিকর, কেননা এই মানচিত্রটি ২০১৬ সাল থেকে অর্থাৎ নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের অন্তত ৩ বছর আগে থেকেই ইন্টারনেটে আছে এবং অতীতেও বিভিন্ন সময়ে নানান দাবি সহ সোশাল মিডিয়ায় ভেসে উঠেছে।

ভাইরাল এই ছবিতে ভারতের ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মানচিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নামের বদলে ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকান দেশের নাম লেখা আছে। এই মানচিত্রে জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখের জায়গায় একত্রে কিউবার নাম লেখা, পশ্চিবঙ্গের স্থানে মিশর, উত্তরপ্রদেশের জাগায় ব্রাজিল এবং রাজস্থা্‌ন, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের স্থানে বিট্রেন, ফ্রান্স ও দক্ষিন আফ্রিকার নাম লেখা। বাকি রাজ্যগুলির নামের জাগাতেও অন্যান্য রাষ্ট্রের নাম লেখা রয়েছে।

ছবির সাথে থাকা লেখায় দাবি করা হয়েছে একজন মার্কিনী কোম্পানির সিইও, যার নাম উল্লেখ করা নেই, তিনি এই মানচিত্রটি তৈরী করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ভারতের একেকটি অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলির সমান। সুতরাং তিনি বলেছেন ভারতের সরকার যে একই সাথে এতগলো রাজ্যে কোভিড-১৯ এর মোকাবিলা করছে তা পরোক্ষভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোভিড-১৯ কে একই সাথে নিয়ন্ত্রন করার সমান। ভাইরাল টেক্সটে আরও বলা হয় যে, ঐ মার্কিন সিইও প্রধানমন্ত্রী মোদিজির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন উনার অসাধারন দক্ষতার জন্য। এও বলা আছে যে গোটা বিশ্ব মোদিজির কাজকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে কিন্তু ভারতের আভ্যন্তরীন ক্রীতদাস এবং বেইমানরা কোভিড-১৯ নিয়ে মোদিজির সমালোচনা করছে।

আরও পড়ুন: কোভিড-১৯ প্রকোপের সময় টেক্সাসে চায়ের বোতলে থুতু ফেলার পুরনো ভিডিও জিইয়ে উঠল

বুম-এর হোয়াটসঅ্যাপ হেল্পলাইন নম্বরেও (৭৭০০৯০৬১১১) এই মানচিত্রটি নিম্নলিখিত ক্যাপশন সহ পাঠানো হয়েছে।

"ভারতের এই মানচিত্রটি একজন আমেরিকান সিইও নতুন করে তৈরি করেছেন, যাতে রাজ্যগুলিকে জনসংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে, যে জনসংখ্যা অন্য অনেক রাষ্ট্রের সমান। উনি তাঁর সংস্থার কর্মচারীদের বোঝাতে চেয়েছেন যেন ভারত বিশ্বের অন্য অনেক দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার চেয়েও চমৎকারভাবে কোভিড-১৯ মহামারীর মোকাবিলা করতে সমর্থ হয়েছে। কেমন ভাবে দক্ষতার সঙ্গে কোনও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়, এটি তারই একটি উদাহরণ। এ ভাবেই তিনি মোদীজির উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। সারা বিশ্ব মোদীজির এই প্রয়াসের প্রশংসা করছে, অথচ কিছু ক্রীতদাস এবং দেশদ্রোহী কোভিড-১৯ মোকাবিলায় তাঁর প্রয়াসের নিন্দা করে চলেছে।"

মূল ইংরেজি ক্যাপশন, "This is Indian map redesigned by an American CEO where he marked the Indian states population which is almost equal to population of some of the countries. He tried to explain to his employees that India is indirectly handling COVID-19 situation of so many countries. It's about the management of the problem in an efficient manner. He praised Modiji in this unique way. The world is recognising efforts of Modiji but some insider slaves and traitors are still criticising Modiji of mismanagement of COVID-19 in India."


টুইটার ও ফেসবুকে বুম অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভারতের মানচিত্র সহ এই পোস্ট দুই সোশাল মিডিয়াতেই ভাইরাল হয়েছে,

Dear Friends, Just have a look This is Indian map redesigned by an American CEO where he marked the Indian states...

Posted by Anchor Sujo on Tuesday, 14 April 2020


ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব পর্যন্ত একই ক্যাপশন সহ মানচিত্রটি শেয়ার করেছেন।

বুম দেখেছে, হিন্দিতে একই ধরনের ক্যাপশন দিয়ে মানচিত্রটি শেয়ার হয়েছে, তবে সেখানে কোভিড-১৯ এর কোনো উল্লেখ নেই। হিন্দি পোস্টে বলা হয়েছে, মানচিত্রটি তৈরি করেছেন এক অনাবাসী ভারতীয়, যিনি একটি মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার সিইও। সেই পোস্টের ক্যাপশনে ভারতের মতো দেশে যেখানে জনসংখ্যা বিশ্বের অনেকগুলি দেশের জনসংখ্যার যোগফলের বেশি, তার পরিচালনার পথে নানা কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে।

#अमेरिका के एक NRI ने, जो कि अमेरिकन कम्पनी का CEO भी है, उसने भारतीय मैप को RE-DESIGN किया है, अपने कर्मचारियों को...

Posted by Reeta Gulati on Saturday, 11 April 2020


আরও পড়ুন: মৎস্যকন্যা মিললো বলে শেয়ার হল অ্যানিমেশান ভিডিও

বুম অনেক অনুসন্ধান করেও কোনও আমেরিকান সংস্থার সিইও-র তৈরি করা এ ধরনের কোনও মানচিত্রের খোঁজ পায় নিl তবে বুম অবশেষে ২০১৬ সালের কয়েকটি পোস্টে মানচিত্রটির সন্ধান পায়। নিজেকে কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রকের কর্মী হিসাবে দাবি করা জনৈক অমিত রঞ্জন-এর একটি টুইটে সর্বপ্রথম এই মানচিত্রের দেখা মেলে। টুইটটির ক্যাপশনে শুধু লেখা: "চিন্তা উদ্রেককারী মানচিত্র—এখানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যকে জনসংখ্যার ভত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।" তবে এখানেও কোনও আমেরিকান সিইও-র তৈরি ম্যাপের কোনও উল্লেখ নেই।

অমিত রঞ্জনের পোস্টের কয়েক দিন পর এই একই মানচিত্রটি শেয়ার করেন ভারতে নিযুক্ত নরওয়ের কূটনীতিক এরিক সোলহাইমl তাঁর টুইটেও ম্যাপটি কার তৈরি, সে বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না।

ক্রমশ মানচিত্রটি সোশাল মিডিয়ায় আরও ভাইরাল হতে থাকে এবং তাতে অতঃপর 'আমেরিকান সিইও' এবং 'অনাবাসী ভারতীয়' ইত্যাদি শব্দ সংযোজিত হতে থাকে।

২০২০ সালের এপ্রিলে আবার মানচিত্রটি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এবং তখনই তার সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলার প্রসঙ্গটি জুড়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: আজতকের ভুয়ো স্ক্রিনশটের দাবি পাক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী কোভিড-১৯ আক্রান্ত

Claim Review :  ছবি দেখায় আমেরিকার সিইও ভারতের কোভিড-১৯ তৎপরতায় মানচিত্র আঁকলেন
Claimed By :  Facebook, Twitter and WhatsApp
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story