সাংসদ নুসরত জাহানের বিরুদ্ধে দারুল উলুম ফতোয়া জারি করেছে সংবাদমাধ্যমের দাবিগুলি মিথ্যে

বুম খঁজে পায়, গণমাধ্যমগুলি এক মুফতির উক্তিতে মিথ্যে বর্ণনা যোগ করেছে, যেখানে ওই ব্যক্তি শুধুমাত্র ভিন্ন সম্প্রদায়ে বিবাহের জন্য নিন্দা করেছিলেন।

ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে বেশ কয়েকটি মূলস্রোতের সংবাদ মাধ্যম দারুল উলুম ইউনিভারসিটির ধর্মগুরুরা সাংসদ নুসরত জাহানের বিরুদ্ধে ফৎওয়া জারি করেছেন বলে মিথ্যে খবর প্রচার করেছে।

এবিপি হিন্দি নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেওবন্দের মুফতি আসাদ কাসমি বলেন জৈন ধর্মাবলম্বী এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে নুসরাত ইসলাম বিরোধী কাজ করেছেন। কারণ, নিজের সম্পদায়ের বাইরে বিয়ে ইসলাম অনুমোদন করে না। তাঁর এই সাক্ষাৎকার বেরনোর পরেই ফতোয়া দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।

বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম কাসমির বক্তব্যের সঙ্গে কিছু অসমর্থিত ও বিভ্রান্তিকর দাবি জুড়ে দিয়ে বলে, দারুল উলুম দেওবন্দের ধর্মগুরুরা জাহানের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন।

এক মুফতির উক্তি কীভাবে এক ফতোয়ায় হল

দেওবন্দের মুফতি ২৮ জুন ২০১৯ তারিখে এবিপি হিন্দি নিউজকে বলেন, “সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জানলাম যে, উনি (জাহান) সংসদে সিঁদুর লাগিয়ে গিয়েছিলেন। খোঁজখবর নিয়ে আরও জানলাম যে, তিনি একজন জৈনকে বিয়ে করেছেন। ইসলাম বলে একজন মুসলমান একজন মুসলমানকেই বিয়ে করতে পারে।”



তিনি আরও বলেন, “শারিয়ত কি বলে, আমি সেটাই শুধু মিডিয়াকে জানাচ্ছি।”
সেই প্রতিবেদনে, জাহানের বিরুদ্ধে ফৎওয়া জারির কোনও উল্লেখ ছিল না। তার সঙ্গে দেওবন্দের কোনও সম্পর্কের কথাও বলা হয়নি।

অথচ ‘নিউজ১৮ হিন্দি’-এর প্রতিবেদনে একটি নতুন তথ্য জুড়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘দেওবন্দের মৌলবি’ জাহানের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামীয় ইউনিভারসিটি। এবং সেটি ১৮৬৭’র দেওবন্দ ইসলামি আন্দোলনের উৎসস্থলও বটে। অতীতে, বিতর্কিত ফতোয়া জারি করার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দ বেশ কয়েকবার প্রচারে এসেছে।

ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২০১০ সালে, পুরুষদের সঙ্গে একই জায়গায় মুসলমান মেয়েদের কাজ করার বিরুদ্ধে এক ফতোয়া জারি করে। ২০১২ সালে, দেওবন্দের কর্মকর্তারা লেখক সালমান রুশদির ভারত সফরের বিরোধিতা করে বিতর্কে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের মতে রুশদির লেখা ইসলামকে আঘাত করেছিল। ২০১৩ সালেও এক ফতোয়া জারি করে ওই প্রতিষ্ঠান ফটোগ্রাফিকে ইসলামবিরুদ্ধ ঘোষণা করে তা নিষিদ্ধ করার দবি তোলে

‘টাইমস নাও’ টিভি সংবাদ চ্যানেল, কাসমি এবিপি নিউজ হিন্দিকে যে কথা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘ফতোয়া’ শব্দটি জুড়ে দেয়। টাইমস নাও তাদের ২৯ জুনের টুইটে বলে, “টিএমসি এমপি সিঁদুর আর মঙ্গলসূত্র পরে সংসদে শপথ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই দেওবন্দ ধর্মগুরুরা এই অভিনেতা-থেকে-নেতার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়ে বলেছেন যে, মুসলমানরা কেবল মুসলমানদেরই বিয়ে করে।”



বুম ওই অংশের ভিডিওটা পুরোটা দেখে। তার মধ্যে কাসমির বক্তব্যটিও ছিল। কিন্তু তাতে কোথাও ‘ফতোয়া’র উল্লেখ ছিল না।

কাসমি বলেন, “জাহান যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। আমি তাঁর জীবনে কোনও ভাবেই হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি কেবল শারিয়তে যা বলা আছে তাই জানালাম।”
জি নিউজ’ও একই ধরনের খবর করে। তাতে দাবি করা হয়, “দেওবন্দের ধর্মগুরুরা জাহানের বিরুদ্ধে ফতোয়া ঘোষণা করেছেন।” ওই প্রতিবেদনে ব্যবসায়ী নিখিল জৈনের সঙ্গে জাহানের বিয়ের ব্যাপারে কাসমির মতামতের কথাও বলা হয়।

জি নিউজের প্রতিবেদন ফতোয়ার কথা দিয়ে শুরু হলেও, খবরের বাকি অংশে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয় না।

একটি ভুল উদ্ধৃতির বেঠিক পরিবেশন

নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ ২৯ জুন বিকেলে একটি খবর ছাপে। তার শিরোনামে লেখা হয়, “ফতোয়া-প্রেমী দার-উল-উলুম অ-মুসলমানের সঙ্গে টিএমসিপি এমপি নুসরত জাহানের বিয়ের ব্যাপারে আপত্তি করেছে।”

জাহানের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করা হয়েছে, নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে অবশ্য এ কথা বলা হয়নি। কিন্তু ওই ইউনিভারসিটি সম্পর্কে বলা হয় সেটি “ফতোয়া-প্রেমী” এবং ‘সবসময় ফতোয়া দেওয়ার জন্য প্রচারের আলোয় আসে।’’

নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর অনুযায়ী, দারুল উলুম দেওবন্দের ধর্মগুরুরা জাহানের বিয়ের ব্যাপারে আপত্তি করেছিলেন। তবে ওই প্রতিবেদনে ইউনিভারসিটির কোনও কর্মকর্তার বক্তব্য নেই। কিন্তু এবিপি নিউজ হিন্দিকে দেওয়া কাসমির বক্তব্যটি আছে। আর সেই সঙ্গে আছে টাইমস নাও এবং জি নিউজে প্রকাশিত ভুল সংবাদটিও।

কাসমি কি দারুল উলুমের সদস্য?

“একেবারেই না। উনি (মুফতি আসাদ কাসমি) আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনও ভাবেই যুক্ত নন,’’ একথা বলেন দারুল উলুমের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র আসরাফ উসমানি।

কাসমি আর ওই ইউনিভারসিটির মধ্যে একমাত্র মিল হল, উভয়ই দেওবন্দ ঘরানার।

উসমানি আরও জানান যে, নুসরত জাহানের বিয়ের ব্যাপারে দারুল উলুম কোনও মন্তব্য করেনি। কোনও ফতোয়াও জারি করেননি তাঁরা। “ভুল ধারণা সৃষ্টি করার জন্য মিডিয়াতে ওই ধরনের মিথ্যে খবর প্রকাশের নিন্দা করি আমরা,” বলেন উসমানি।
‘অল্ট নিউজ’ এই খবরটিকে আগে খন্ডন করেছে।

Claim :   সাংসদ নুসরত জাহানের বিরুদ্ধে দারুল উলুম একটি ফতোয়া জারি করেছে
Claimed By :  মূলধারার গণমাধ্যমগুলি
Fact Check :  FALSE
Show Full Article
Next Story
Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors.
Please consider supporting us by disabling your ad blocker. Please reload after ad blocker is disabled.