ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন দিশা, এবার কেমো দিলে রোধ করা যাবে চুল পড়া

স্তন ক্যানসারের রোগীদের কেমো দেওয়ার ফলে তাদের চুল পড়া বন্ধ করতে বিশেষ এক পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার সময় কেমো দেওয়ার ফলে চুল পড়া বন্ধ করতে এক বিশেষ পদ্ধতি চালু করতে চলেছে মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল।

কেমোথেরাপি হল ক্যানসার চিকিৎসার একটি পদ্ধতি। ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করতে, বা সেগুলিকে সরাসরি মারার জন্য, অথবা সেগুলির বিভাজন রুখতে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়। কেমোর ওষুধ খাইয়ে, ইনজেকশনের মাধ্যমে, শিরার মধ্যে সঞ্চালিত করে, অথবা ত্বকের ওপর লাগিয়ে শরীরে ঢোকান যায়। তবে তা নির্ভর করে ক্যানসারটি কি ধরনের, তার ওপর। কেমোথেরাপি একক ভাবে দেওয়া যায়। অথবা সার্জারি, রেডিয়েশন বা জৈব উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার সঙ্গেও চালানো হয়।

আমাদের দেশে, চুল পড়ে যায় বলে অনেক মহিলা কেমোথেরাপি এড়িয়ে চলেন। এমনটাই মনে করেন চিকিৎসকরা।

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ লক্ষ মহিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকাল রিসার্চ-এর (আইসিএমআর) হিসেব অনুযায়ী, তাদের মধ্যে প্রায় ৭০,০০০ মহিলা মারা যান।

বিগত দু’ বছর ধরে টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল একটি নতুন পদ্ধতি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রয়োগ করছে। সেটি হল, ‘স্ক্যাল্প ক্যাপ কুলিং টেকনলজি’ বা মাথার খুলি ঠাণ্ডা করার প্রযুক্তি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)’ (খাদ্য এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা) দ্বারা অনুমোদিত।

স্ক্যাল্প কুলিং টেকনলজি কি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ২০১৫ নাগাদ এই প্রযুক্তিটি অনুমোদন করে। এটি মাথার খুলি ঠাণ্ডা করে, চুলের গোড়ায় রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয়। ফলে সেখানে কেমোর রাসায়নিক পদার্থগুলির যোগান কমে যায়।

কুলিং ক্যাপ বা মাথা ঠাণ্ডা করার টুপি ফ্রিজে রাখা হয়।

ওই শীতল তাপমাত্রা ট্যাক্সেন ও অ্যান্থ্রাসাইক্লিনের মতো ওষুধকে চুলের কোষের কাছে পৌঁছতে দেয় না।

সুইডেনের কম্পানি ডিগনিক্যাপ এবং ব্রিটিশ এজেন্সি প্যাক্সম্যান এফডিএ অনুমোদিত ওই প্রযুক্তির প্রস্তুতকারক। মাথার খুলি ঠাণ্ডা করার ওই টুপিটি কেমো দেওয়া শুরু হওয়ার আগে লাগাতে হয়, আর বদলাতে হয় ৩০ মিনিট অন্তর। কেমোর পরেও সেটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লাগিয়ে রাখতে হয়।

বর্তমানে কেমোথেরাপিতে ট্যাক্সেন এবং অ্যান্থ্রাসাইক্লিন, এই দুটি ওষুধই প্রয়োগ করা হয়। আর মাথার খুলি ঠাণ্ডা করার এই প্রযুক্তি চুল পড়া বন্ধ করার ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক বলেই দেখা গেছে।

তবে কেমোথেরাপিতে অন্য ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করে দেখা হয়নি এখনও।

বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যান্থ্রাসাইক্লিনের তুলনায় ট্যাক্সেন ব্যবহারে চুল পড়ার হার কম হয় আর পুনরায় চুল গজানোর হার হয় বেশি।

টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালের পরীক্ষার ফলাফল

টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল ৫১ জন স্তন ক্যানসারের রোগীর ক্ষেত্রে প্যাক্সম্যানের মেশিনটি ব্যবহার করে।

গবেষণাটি করেন ডঃ জ্যোতি বাজপায়ী। ৩৪ জন মহিলা প্রযুক্তিটি প্রয়োগ করার ব্যাপারে রাজি হন। আর ১৭ জন থাকেন ‘কন্ট্রোল’ টিমে। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, প্যাক্সম্যানের যন্ত্রটি ব্যবহার করার ফলে চুল পড়া, চুল পড়া রোধ, আর নতুন করে চুল গজানোর আনুপাতিক হার কেমন থাকে তা দেখা।

রোগীদের মাথায় ওই খুলি ঠাণ্ডা করার টুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা থাকে ওই টুপির। মাথায় লাগানো থাকে ৩০ মিনিট। কেমো দেওয়া শেষ হওয়ার পর, আরও ৯০ মিনিট মাথায় লাগিয়ে রাখতে হয় ওই টুপি।

দেখা যায়, যারা ওই টুপি পরে ছিলেন, তাদের মাথায় ৫৬% চুল থেকে যায়, আর ৮৫% এর নতুন চুল গজায়। অন্যদিকে, যাদের মাথায় ওই টুপি ছিল না, তাদের ১০০% চুল পড়ে যায়। আর চুল গজায় ১২% এর।

এই গবেষণা বিশ্বে অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে মিলে যায়। দেখা যায়, অ্যান্থ্রাসাইক্লিনের তুলনায় ট্যাক্সেনের ফল ভাল।

কেমোথেরাপিতে চুল পড়ে যাওয়ায় সঙ্কোচবোধ

টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল কেন এই পরীক্ষা চালায় তা জানতে আমরা ডঃ জ্যোতি বাজপায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করি।

“চুল হারানোকে এক ধরনের কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়। আমরা দেখেছি, এর ফলে মহিলাদের অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। তাই তারা কেমো নিতে চান না,” বলেন ডঃ বাজপায়ী।

উনি আরও বলেন যে, এই চিকিৎসা পদ্ধতির খরচ সামর্থ্যের মধ্যেই থাকবে। আর এটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সকলের জন্য চালু করার ব্যাপারে হাসপাতাল অচিরেই সিদ্ধান্ত নেবে।

Next Story