Connect with us

পাক বায়ুসেনার উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের রহস্যময় গল্প

পাক বায়ুসেনার উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের রহস্যময় গল্প

ভারত-পাক আকাশ সংঘর্ষের সময় নিহত পাক পাইলট উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনকে নিয়ে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, যার ভিত্তি কেবল জনশ্রুতি এবং বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ার ভিত্তিহীন দাবি

২৭ ফেব্রুয়ারি সীমান্তে আকাশ-যুদ্ধের সময় গুলিবিদ্ধ বিমান থেকে প্যারাশুটে করে উইং কমান্ডার অভিনন্দন নেমে গিয়ে পড়েন পাক-অধিকৃত কাশ্মীর ভূখণ্ডে । ওই সংঘর্ষের সময় নাকি একটি পাক বিমানও গুলিবিদ্ধ হয়ে ভেঙে পড়ে, যার পাইলটকে ঘিরে রহস্য এক ভুয়ো খবরের জন্ম দিয়েছে অস্তিত্বহীন এক পাক উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের নাম নিয়ে ।

১ মার্চ, অর্থাৎ অভিনন্দনকে পাক বাহিনী তাদের হেফাজতে নেওয়ার দু দিন পরে হঠাত্ই ভেঙে পড়া দ্বিতীয় বিমানটির পাইলট উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের নামে সোশাল মিডিয়ায় গল্পের বন্যা বয়ে যায় ।

টুইটটির আর্কাইভ বয়ান দেখতে এখানে ক্লিক করুন ।

বুম এই বিবরণীর উত্স খুঁজে পায় জনৈক খালিদ উমরের একটি ফেসবুক পোস্টে, যাঁকে টাইমস অফ ইন্ডিয়া বর্ণনা করেছে পাক বংশোদ্ভূত, অধুনা ব্রিটেনে অভিবাসী এক আইনজীবী হিশেবে ।

ফেসবুক পোস্টটির আর্কাইভ বয়ান দেখুন এখানে

খালিদ উমরের ভাইরাল হওয়া ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী সাহাজাজুদ্দিনও গুলিবিদ্ধ ও ভেঙে পড়তে থাকা বিমান থেকে একই ভাবে প্যারাশুটে করে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের মাটিতেই অবতরণ করেন । কিন্তু স্থানীয় জনতা তাঁকে শত্রুপক্ষের বৈমানিক ভেবে প্রচণ্ড পেটায়, যার ফলে পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান ।

খালিদ উমরের গল্পে উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনও হয়ে ওঠেন পাক বায়ুসেনার এয়ার মার্শাল ওয়াসিমউদ্দিনের পুত্র, ঠিক যেমন ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডার অভিনন্দনও প্রাক্তন এয়ার মার্শালের পুত্র ।

বুম বেশ কয়েকটি এমন হোয়াট্স্যাপ বার্তা খুঁজে পায়, যাতে পাক সংবাদমাধ্যম ডন-কে সাহাজাজুদ্দিনকে নিয়ে কোনও নিবন্ধ লিখতে নিষেধ করছে পাক সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন্স ।

এটা ভারতীয় মিডিয়ার নজর এড়ায়নি । তাই বেশ কিছু সংবাদসূত্র দ্বিতীয় পাইলটের নিয়তি নিয়ে খালিদের বিবরণীটি উদ্ধৃত করতে থাকে ।

এই সংবাদ রিপোর্টগুলিতে দাবি করা হয়, পাক সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আসিফ গফুর যে প্রথমে দু জন পাইলটকে গ্রেফতার করার কথা ঘোষণা করে পরে বিবৃতি পাল্টে মাত্র একজন পাইলটকে হেফাজতে নেওয়ার কথা বলেন, তাতেই স্পষ্ট যে পাকিস্তান ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে চাইছে ।

খালিদ উমর টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে জানান, দ্বিতীয় পাইলট সাহাজাজুদ্দিনের পরিচয় তাঁকে জানান ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের এয়ার মার্শাল রঘুনাথ নাম্বিয়ার । এর ফলে আমরা ধরে নিই, খবরটির ভিত্তি নিছক জনরব ।

এয়ার মার্শাল নাম্বিয়ারের টুইট অনুযায়ী দ্বিতীয় পাইলটের পরিচয় পাক বায়ুসেনার তরফেই প্রকাশ করা হয় ।

তবে বুম পাক বায়ুসেনার তরফে এধরনের কোনও বক্তব্যের খোঁজ পায়নি, যেহেতু বালাকোটের জবাবি হামলায় পাক বায়ুসেনার প্রত্যাঘাত এবং কে-কে তাতে অংশ নিয়েছে, সে বিষয়টি পাক সেনা কর্তৃপক্ষ আগাগোড়া গোপন রাখে ।

উইং কমান্ডার আগা মেহের-এর প্রবেশ

পাক গণমাধ্যমও দ্রুতই এই খবরের গন্ধ পেয়ে যায় এবং পত্রপাঠ তা নস্যাৎ করতে উঠে-পড়ে লাগে ।

পাক সংবাদ-চ্যানেল জিও নিউজ ভারতীয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যে খবর ছাপার অভিযোগ এনে বলে, ছবিতে যে ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে, তিনি গ্রুপ ক্যাপ্টেন আগা মেহের এবং তিনি বেঁচে আছেন, ভালও আছেন ।

চ্যানেলটি প্রখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক ওয়াজাহাত সইদ খানের একটি টুইট উদ্ধৃত করে, যাতে তিনি দাবি করেন যে, ছবির ব্যক্তিটি তাঁর একজন বন্ধু, যিনি ভারতীয় মিডিয়ায় তাঁর ছবি ভুয়ো বিবরণ সহ ভাইরাল হতে দেখে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ।

বুম সইদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পারেনি । এ বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী রিপোর্টটি পরিমার্জন করা হবে ।

তথ্য যাচাই

বুম পাক সংবাদপত্র ডন-এর প্রধান সম্পাদক জাফর আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটা জানার জন্য যে, সত্যি-সত্যিই ভাইরাল হওয়া হোয়াট্সঅ্যাপ বার্তার দাবি অনুযায়ী সাহাজাজুদ্দিনের মৃত্যু সংক্রান্ত খবর ছাপায় পাক সেনা কর্তৃপক্ষের কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল কিনা ।

আব্বাস পত্রপাঠ বিষয়টি নস্যাৎ করে বলেন, “আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি যে এ ধরনের কোনও খবর আমরা ছাপিওনি, বা কেউ আমাদের ছাপতে বারণও করেনি” ।

বুম চায়না আর্মস নামে একটি ওয়েবসাইটের খোঁজ পায়, যাতে ২০১৫ সালের ৪ অক্টোবর ওই একই ছবি পোস্ট হয়েছিল, যাতে বিমানটিকে এস-ইউ-৩০ বিমান হিসাবে শনাক্ত করা হয়, যদিও তার পাইলটের পরিচয় দেওয়া হয়নি ।


গত এক সপ্তাহ ধরে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই তাদের সামরিক গতিবিধি নিয়ে যে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে, তাতে ওই পাইলটের পরিচয় শনাক্ত করা বুম-এর পক্ষে সম্ভব হয়নি ।

গুগল-এ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আগা মেহের কিংবা উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিন শব্দগুলি সাজিয়ে খোঁজখবর চালিয়েও বুম নিশ্চিতভাবে কোনও শনাক্তকরণ করতে পারেনি । তবে আমরা পাক বায়ুসেনার এক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল ওয়াসিমুদ্দিনের অস্তিত্ব জানতে পারি (যাঁকে সাহাজাজুদ্দিনের পিতা বলে চালানো হচ্ছে), যাঁকে ২০১৮ সালের ৮ জুন সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এ ভাষণ দিতে দেখা যাচ্ছে ।

ভিডিওটিতে তাঁর পদ বলা হয়েছে প্রাক্তন উপ-বায়ুসেনাধ্যক্ষ, যা উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের পিতার পরিচয়ের সঙ্গে মিলে যায়, আর এখানেই খালিদ উমরের ছড়ানো গল্পটির অনুপ্রেরণা ।

‘h’ নামের এক টুইটার ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তিনি ওয়াসিদুদ্দিনকে ভাল মতো চেনেন এবং তাঁর দুই পুত্রের কেউই সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়নি । ওই দুই পুত্রের একজন আলিমুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি স্ক্রিনশটও তিনি পোস্ট করেছেন ।

আলিমুদ্দিনের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও বুম খুঁজে পেয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর বাবা ওয়াসিমুদ্দিন এবং ভাই ওয়াকারউদ্দিনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা ছবিও পোস্ট করেছেনঃ

ওয়াসিমুদ্দিনের ফেসবুক প্রোফাইলে তাঁকে পাকিস্তানি বায়ুসেনার একজন ফাইটার পাইলট হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

বুম ওয়াকারউদ্দিন এবং ওয়াসিমুদ্দিনের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখেছে, বাবার সঙ্গে দুই ভাইয়ের আরও অনেকগুলি ছবি সেখানে স্থান পেয়েছেঃ

উপরের এই ছবিগুলির সঙ্গে ইউ-টিউবে এয়ার মার্শাল ওয়াসিমুদ্দিনের ভিডিওর ছবি তুলনা করে বুম দেখেছে, উভয়ে একই ব্যক্তি এবং ছবিতে জোড়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিও তাঁরই । তাঁদের কারও প্রোফাইলেই সাহাজাজ নামে কোনও তৃতীয় সন্তানের উল্লেখ নেই ।

বুম ফেসবুকের মারফত ওয়াসিম, ওয়াকার এবং আলিম তিনজনের সঙ্গেই যোগাযোগ করে তাঁদের বক্তব্য জানতে চেয়েছে । তা পাওয়া গেলেই রিপোর্টটি সেই অনুসারে পরিমার্জন করা হবে ।

এয়ার মার্শালের কোনও ছেলে কি সেনাবাহিনীতে কাজ করে? বুম ওয়াকার ও আলিমুদ্দিনের লিংকড-ইন প্রোফাইল ঘেঁটে বুঝেছে, তেমন সম্ভাবনা কমইঃ

এ থেকে আমরা ধরে নিতে পারি যে এয়ার মার্শাল ওয়াসিমুদ্দিনের অস্তিত্বহীন তৃতীয় পুত্র হিসাবে উইং কমান্ডার সাহাজাজুদ্দিনের গল্পটি কতটা ভুয়ো এবং তার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে এসেছিল ।

(BOOM is now available across social media platforms. For quality fact check stories, subscribe to our Telegram and WhatsApp channels. You can also follow us on Twitter and Facebook.)

Claim Review : Wing Commander Shahzaz Ud Din of Pakistani Air Force lost his life during the aerial engagement with IAF Wing Commander Varthaman

Fact Check : FALSE


Continue Reading

Archis is a fact-checker and reporter at BOOM. He has previously worked as a journalist for broadsheet newspapers and in communications for a social start-up incubator. He has a Bachelor's Degree in Political Science from Sciences Po Paris and a Master's in Media and Political Communication from the University of Amsterdam.

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top