বোমা নয়, 'কাঁদানে গ্যাসের গোলা' জানাল হাওড়া সিটি পুলিশ

নবান্ন অভিযানে পাথর ছোঁড়া ও ব্যারিকেড ভাঙা ঠেকাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছোঁড়ে—এমনই দাবি হাওড়া সিটি পুলিশের।

হাওড়া পুলিশের বাড়ির ছাদ থেকে কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছোঁড়ার ভাইরাল ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বিজেপির যুব মোর্চার নবান্ন ঘেরাও অভিযানের মিছিলে বিজেপি কর্মীদের লক্ষ্য করে পুলিশ বোমা ছুঁড়েছে।

ফোনের ক্যামেরায় তোলা ১ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড সময়ের ওই ভিডিওতে তিনজন পুলিশকর্মীকে বাড়ির ছাদ থেকে সাদা রঙের গোলাকার গোলা ছুঁড়তে দেখা যায়। পুলিশ কর্মীরা ছাড়াও ওই ছাদে এক মহিলা সহ, আরও চারজন (দু'জন ক্যামেরা হাতে) ব্যক্তিকে দেখা যায়।

ওই ভিডিওটির আড়াল থেকে হিন্দিতে বলতে শোনা যায়, ''এই পুলিশ বোমার গোলা ছুঁড়ছে যেমনটা আপনারা দেখছেন। জোর করে। পুলিশের অত্যাচার হচ্ছে এভাবে। এই দেখুন, আরেকটা বোমা ছুঁড়ছে পুলিশ। এটা মমতার পুলিশ, অত্যাচারীর পুলিশ। এখানে মমতার দ্বারা নেতাদের হত্যা হয়। পুলিশ হায় হায়, টিএমসি হায় হায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হায় হায়।''

তারপর ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেখানো হয় রাস্তায় শুয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে। তাকে ঘিরে জটলা দেখা দেখা যায় বেশ কয়েকজনের।

বিজেপি দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাশ বিজয়বর্গীয় ওই ভিডিও টুইট করে লেখেন, ''বিজেপির আন্দোলনে কলকাতা পুলিশ টিএমসি গুন্ডাদের মতো ব্যবহার করেছে আর ছাদ থেকে বিজেপি কর্মীদের উপরে বোমা ফেলে! পুলিশ এই সব কাজকর্ম করেছে সরকারের সম্মতিতে! পুলিশের এই ধরণের হামলাতে অন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৫০০ এর বেশি দলীয় কর্মী আঘাত পেয়েছে।''

টুইটি দেখা যাবে এখানে। টুইটটি আর্কাইভ করা আছে এখানে

পুলিশ বিজেপির মিছিলের উপরে বোম ছোঁড়ে একই বয়ানে ফেসবুকেও ভাইরাল হয়েছে ভিডিওটি।

ফেসবুক পোস্টটিতে ক্যাপশন লেখা হয়, ''দেখুন পুলিশ কি ভাবে বিজেপির মিছিলের উপরে বোম মারছে''

পোস্টটি দেখা যাবে এখানে। পোস্টটি আর্কাইভ করা আছে এখানে

সাংবাদিকের দাবি

কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ের টুইট কোট করে বোমা ফেলার যুক্তি খারিজ করে দেন টাইমস নাউয়ের সাংবাদিক শ্রেয়সী দে। তিনি টুইটে লেখেন, ''ভিডিওটি খবরের চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে। ওই হল আমার ক্যামেরাম্যান ও আমি— লাইভ ছিলাম হাওড়া ময়দান থেকে। ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে তা হল পুলিশেরা 'ধোয়া বোমা' ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করছে, যারা ব্যরিকেড টপকে ইঁট ছুঁড়ছিল।''

শ্রেয়সী আরেকটি টুইটে লেখেন, ''যখন রিপোর্টিং করছিলাম, প্রথম ব্যারিকেডগুলো ভেঙে পড়ে। তারপর পাথর ছোঁড়া হয়। পুলিশ জলকামান ও লাঠিচার্জের পর কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে। এলাকা থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়। তাজা বোমা ছোঁড়া হচ্ছিল তখন।''

পুলিশের দাবি কাঁদানে গ্যাস

কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও শ্রেয়সীর টুইটের দুটি ছবি পাশাপাশি রেখে টুইট করে বোমার দাবিটি 'বিভ্রান্তিকর' বলে জানিয়েছ হাওড়া সিটি পুলিশ।

হাওড়া সিটি পুলিশ টুইট করে জানায়, ''পুলিশের একটি কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছোঁড়ার গতকালের ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়াচ্ছে। একদল পুলিশ ছাদে যান যখন বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভাঙে ও পাথর ছুঁড়তে শুরু করে। গণমাধ্যমের কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।''

'কাঁদানে গ্যাস' বনাম 'ধোঁয়ার বোমা' ও 'ধোঁয়া গ্রেনেড'

সায়েন্স ডিরেক্ট-এর গবেষণাপত্র অনুযায়ী কাঁদানে গ্যাসের বলে সারা পৃথিবীতে যে রাসায়নিক সংমিশ্রণের ব্যবহার করা হয় তার নাম মেস বা ক্লোরোঅ্যাসিটোফেনন। যার সংস্পর্শে এলে সাময়িক ভাবে মিউকাস মেম্ব্রেন ও ত্বকেরপ্রদাহ, চোখে জ্বালা ভাবের সঙ্গে জল বেরনো, কাশি ও শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা হতে পারে। বেশিক্ষণ কাঁদানে গ্যাসের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট মারাত্মকও হতে পারে।

অন্যদিকে 'ধোয়া বোমা' সাধারণত জিঙ্ক ক্লোরাইডের ধোঁয়া যা তৈরি হয় হেক্সাক্লোরোইথেন ও জিঙ্ক অক্সাইডের বিক্রিয়াতে। যার সংস্পর্শে এলে শ্বাসযন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

১৯৯৩ সালে জেনেভার রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র কনভেনশনে কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনাদের উপর প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ। বিভিন্ন দেশেই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা বা দাঙ্গা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাময়িক ভাবে লঘু ধরণের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

স্মোক গ্রেনেড ব্যবহার করা রঙিন ধোয়া তৈরিতে। সামরিক প্রশিক্ষণ কিংবা আকাশের জেটপ্লেন নিঃসৃত ধোওয়াও হল একই ধরণের। লাল, বেগুনি, সবুজ রঙে ব্যবহার করে রঙিন করা হয় এই ধোয়াকে।

এক ঝলকে কাল যা যা ঘটেছে

বৃহস্পতিবার বিজেপির যুব মোর্চার ডাকে নবান্ন অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমার বাঁধে বিজেপি কর্মী ও রাজ্য পুলিশের। স্যানিটাইজেশনের কাজ চলা নবান্নের বিভিন্ন দপ্তর কার্যত বন্ধ থাকলেও ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তায় ঘিরে ফেলা হয় রাজ্য সরকারের প্রধান কার্যালয়। নবান্নের আশে পাশে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা।

হওড়া ও কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা পুলিশ বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে দেয়। সাঁতরাগাছি থেকে বাইক চেপে অভিযানে আসছিলেন বিজেপি সমর্থকরা। ওই দিকে নেতৃত্বে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক সায়ান্তন বসু ও সহ-সভাপতি রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় কর্মীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বাঁধে। পুলিশের দিকে ইঁট ছোঁড়া হয় বলে অভিযোগ। কাঁদানে গ্যাসের শেল ও জলকামানে নীল বাদুড়ে রঙ মিশিয়ে সামাল দেওয়া হয় বিজেপি কর্মীদের।

রঙিন জল নাকে মুখে লেগে অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। হাসপতাল সূত্রে খবর, সুস্থ্য আছেন তিনি। বিজেপির তরফে অভিযোগ জলকামানে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়েছে। পুলিশের তরফে অবশ্য জলকামানে সাধারণ নীল রঙ ব্যবহারের কথা বলা হয়। সে ব্যাপারে অনুমোদন ছিল রাজ্যের।

ময়দানের কাছে বলবন্ত সিংহ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৯ এমএম পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি বিজেপির যুব নেতা তেজস্বী সূর্যদের কাছেই ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। পিস্তলটি কাশ্মীরের রাজৌরি জেলার। বিজেপির তরফে অবশ্য দাবি করা হয় বলবন্ত যুব মোর্চার নেতা প্রিয়ঙ্কর পান্ডের দেহরক্ষী।

অরবিন্দ মেনন, তেজস্বী সূর্য, কৈলাশ বিজয়বর্গীয় ছাড়াও রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, লকেট চট্টোপাধ্যায়, সৈমিত্র খান, হেলমেট পরে অর্জুন সিংহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দেন এই নবান্ন অভিযানের।

আরও পড়ুন: না, ভাইরাল ছবিটি এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান বিমানের অন্দরসজ্জা নয়

Show Full Article
Next Story