চোপড়া কাণ্ড: বাংলার ঘটনা বলে ভাইরাল হল বিহারের ছবি

বুম দেখে ভিডিওতে ব্যবহার করা ছবিটি বিহারে সম্প্রতি মারা যাওয়া জ্যোতি কুমারী নামে এক কিশোরীর।

উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার সোনারপুরে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সোশাল মিডিয়ায় ছড়ালো বিহারের পাতরে মারা যাওয়া এক কিশোরীর ছবি। পশ্চিমবঙ্গের নারী সুরক্ষা নিয়ে তৈরি বঙ্গ বিজেপির সমালোচনামূলক ভিডিওতেও ব্যবহার করা হয় বিহারের ওই কিশোরীর ছবি। ওই একই ভিডিও শেয়ার করে বিজেপি মুখপাত্র অমিত মালব্য। চাপড়ার ঘটনায় পরিবারের তরফে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হলেও পরে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।

এরকম একটি ফেসবুক পোস্টে ঘাস জমিতে পড়ে থাকা এক কিশোরীর ছবি ও ধর্ষণে অভিযুক্তের ছবি শেয়ার করা হয়। ছবিদুটি শেয়ার করে ক্যাপশন লেখা হয়, "উঃ দিনাজপুরে চাপড়াই,হিন্দু নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করে মোঃ নাসিরউদ্দিন, এই জানোয়ারের ফাঁসি চাই।"


পোস্টটি আর্কাইভ করা আছে এখানে

১৯ জুলাই ২০২০ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির ফেসবুকটুইটার হ্যান্ডেল থেকে ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওটি টুইট করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও নারী সুরক্ষা নিয়ে বিঁধেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ওই টুইটে ক্যাপশন লেখা হয়, ''একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর শাসনকালে একের পর এক খুন ও ধর্ষণ ঘটছে অথচ তিনি নির্বিকার! নারী সুরক্ষার প্রতি মমতা ব্যানার্জির সরকার কি আদৌ দায়বদ্ধ?''

ওই ভিডিওর ১৫ সেকেন্ড সময়ে দেখা যায় ফুল ছাপ জামা পরা ঘাস জমিতে পরে থাকা এক তরুনীর দেহ।


একই ভিডিও টুইট করেন বিজেপি মুখপাত্র অমিত মালব্য। তিনি ওই টুইটে লেখেন, ''বাংলার উত্তর দিনাজপুর জেলায় একটি ১৬ বছর বয়সীকে গুম। পরে তার অর্ধ-নগ্ন, সংজ্ঞাহীন দেহ চাবাগানের কাছে এক বটগাছের নীচে পাওয়া যায়। ডাক্তাররা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে। স্থানীয়দের দাবি সে গণধর্ষিত ও বিষক্রিয়ায় মৃত্যু। তার দোষ? তার ভাই বিজেপি বুথ সভাপতি।''

(ইংরেজিতে মূল টুইট: ''A 16 year old, in Bengal's North Dinajpur district is abducted. Later, her half-naked, unconscious body is found under a banyan tree near a tea garden. Doctors declare her 'brought dead'. Locals say she was gang-raped and poisoned. Her crime? Her brother is BJP's booth president.''

টুইটটি আর্কাইভ করা আছে এখানে

চোপড়ার ঘটনা

উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ার সোনারপুরে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ এক ছাত্রীর দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সোমবার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। দফায় দফায় জাতীয় সড়ক অবরোধের পর পোড়ানো হয় পুলিশের গাড়ি, সরকারী বাস। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের তরফে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও রবার বুলেট ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। ইঁটবৃষ্টিতে ঘায়েল হয় বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মী।

রবিবার কাকভোরে রাস্তার ধার থেকে ওই তরুনীর দেহ উদ্ধার করে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করে চিকিৎসকেরা। পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয় স্থানীয় এলাকার একটি ছেলে তাদের মেয়েকে ধর্ষণ করে খুণ করেছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। এলাকাবাসীর দাবি ছেলেটির সঙ্গে প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক ছিল ওই মেয়ের। পরে পুলিশের তরফে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানানো হয় ধর্ষণ নয় বিষপানে মৃত্যু ওই ছাত্রীর।

মঙ্গলবার অভিযুক্ত ফিরোজ আলমের লাশ উদ্ধার হয়। বুধবার পাওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায় ফিরোজ আলমেরও মৃত্যুর কারণ বিষক্রিয়া। মেয়েটির বাড়ির তরফে ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয় থানায়। পরে ছেলেটির পরিবারের তরফে মৃত কিশোরীর পরিবারের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করলে মৃত কিশোরীর বাবা ও দুই দাদাকে গ্রেফতার করে চোপড়া থানার পুলিশ।

তথ্য যাচাই

বুম ভিডিওটির স্ক্রিনশট রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ছবিটি উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ার সোনারপুরে নিহত তরুনীর দেহ নয়। বুম দেখে প্রাণহীন দেহের ভাইরাল ছবিটি জ্যোতি কুমারীর, যাকে ১ জুলাই ২০২০ বিহারের পাতর গ্রামের একটি বাগানে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

হিন্দুস্তানের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩ বছর বয়সী জ্যোতি কুমারী একটি বাগানে আম কুড়াতে গেলে ১ জুলাই তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মৃতার বাবা অভিযোগ করেন যে বাগানের মালিক অর্জুন মিশ্র ধর্ষণ ও খুন করেছে বাগান থেকে আম চুরি করার জন্য। মৃতার পরিবার একই অভিযোগে একটি এফআইআর দায়ের করছে। খবরে আরও প্রকাশ এটিকে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুমের পক্ষে মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জ্যোতি কুমারীর সমনামী আরেক বালিকা জ্যোতি কুমার পাসওয়ান লকডাউনের সময় বাবাকে সাইকেল কেরিয়ারে চাপিয়ে গুরুগ্রাম থেকে দারভাঙ্গা সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরলে সংবাদ শিরোনামে আসে।

আগে এই ছবিটিই এই সাইকেল কন্যার মৃতদেহ বলে ভাইরাল হয়েছিল। বুম সেসময় ছবিটিকে তথ্য-যাচাই করে।

ন্যাশনাল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো ছবিটি ফেসবুকে পোস্টে করে ভুয়ো দাবিটি খণ্ডন করে। এই ছবিটিও পরে পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা বলে শেয়ার হতে থাকে।

উল্লেখ্য উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদে বিজেপি বিধায়ক দেবেন্দ্র নাথ রায়ের ঝুলন্ত দড়িবাঁধা দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। বিজেপি ও পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা তাকে খুন করেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলা হয়। অর্থতছরুপের অভিযোগ ওঠে মৃত বিধায়কের নামে। পরিবাবের তরফে রাজ্য পুলিশ ও সিআইডি তদন্তের উপর অনস্থা প্রকাশ করে সিবিআই তদন্তের দাবি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় দেবেন্দ্র নাথ রায়ের স্ত্রী। মামালাটি খারিজ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট।

চোপড়ার ঘটনায় সোশাল মিডিয়ায় বিচ্ছিন্ন ধর্ষণের ঘটনার ধর্ষকের ধর্ম পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর পোস্ট ভাইরাল হয়। বুম ওই ভুয়ো দাবি খণ্ডন করেছে।

আরও পড়ুন: চোপড়া কাণ্ড: বিভ্রান্তিকর গ্রাফিকে ধর্ষণে দায়ীদের লাগানো হল ধর্মীয় রঙ

Claim Review :   ছবির দাবি ধর্ষণে নিহত চোপড়ার কিশোরীর ছবি
Claimed By :  Social Media
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story