এক মুসলমান ব্যক্তির ছবি যেভাবে কৃষক বিক্ষোভ কলঙ্কিত করতে ব্যবহার হল

বুম মোহালির ওই ইলেকট্রিশিয়ান নাজির মহম্মদের সঙ্গে কথা বলেছে, তিনি পুলিশে অভিযোগ করার কথা জানান।

নাজির মহম্মদ নামে পাগড়ি পরিহিত এক মুসলমান ব্যক্তির একটি পুরনো ছবি সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে যে ছবিটি কৃষকদের 'দিল্লি চলো' অভিযানের, এবং ধর্ম পরিচয়ে মুসলিম নাজির শিখ ধর্মাবলম্বীর ছদ্মবেশে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

বুম নাজির মহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি মোহালির সাহিবজাদা অজিত সিং নগরের সুখগড় গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর ছবি ও নাম ব্যবহার করে এই অপপ্রচার চলছে জেনে নাজির স্তম্ভিত।
নাজির মহম্মদ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদে কর্মরত। ভুয়ো দাবিসমেত তাঁর ছবি ভাইরাল হওয়ায় তিনি পুলিশের সাইবার সেলে অভিযোগ দায়ের করেছেন। নাজির বুমকে বললেন, "এ দেশে মুসলমান হওয়া কি এত বড় অপরাধ যে গোটা দেশের মানুষ একটা ছোট গ্রামের এক অজ্ঞাত যুবকের ছবি শেয়ার করছে?"
ফেসবুক ও টুইটারে যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি একটি কোলাজ। তাতে নাজিরের দুটি ছবি আছে—একটিতে তিনি পাগড়ি পরে আছেন, অন্যটিতে নেই। ছবিতে তাঁর নামটি হাইলাইট করা আছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, "এবার আসরে নামল নাজির মহম্মদ। সে পাগড়ি পরে শিখ কৃষক সেজেছে। সত্যি কথা হল, এটা কৃষকদের আন্দোলনই নয়, খালিস্তানি প্রচার। এই লোকগুলোই নয়া নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী বিক্ষোভে ও শাহিন বাগে উপস্থিত ছিল।"
(হিন্দিতে মূল পোস্ট: ''और फिर Nazeer Mohd. पगड़ी पहनकर Sikh किसान बन गए. सच्चाई ये है कि ये किसान आंदोलन नही बल्कि Khal'ist'ani प्रोपगंडा है, ये वही लोग हैं जो CAA प्रोटेस्ट्स और Shaheen Bagh में भी शामिल थे)
পোস্টটি দেখা যাবে এখানে, এবং আর্কাইভ করা আছে এখানে
অন্য একটি ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে যে কৃষকদের এই বিক্ষোভ আসলে খালিস্তানি চক্রান্ত, এবং মূল উদ্দেশ্যকে গোপন রাখার জন্য তাতে মুসলমানদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
পোস্টটি আর্কাইভ করা আছে এখানে
যোগী আদিত্যনাথের তথ্য পরামর্শদাতা শলভ মণি ত্রিপাঠি সহ ভারতীয় জনতা পার্টির বেশ কিছু নেতা এই মিথ্যে দাবিটিকেই টুইট করেন, এবং দাবি করেন যে মহম্মদ এই বিক্ষোভ অংশগ্রহণ করার জন্য শিখের ছদ্মবেশ নিয়েছেন।

বুম প্রথমে এই নামটি দিয়ে ফেসবুক প্রোফাইল সার্চ করে, এবং ভাইরাল পোস্টে যে প্রোফাইলটি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটির খোঁজ পায়। প্রোফাইলটি এখন লক করা হয়েছে, কিন্তু বুম তার আগেই তার ছবি ও পোস্টগুলি দেখেছিল। তাতে দেখা গিয়েছে, যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছে, নাজির তা পোস্ট করেছিলেন ২০২০ সালের ৮ এপ্রিল। অর্থাৎ, যে কৃষি বিল নিয়ে এই বিক্ষোভ চলছে, সংসদে তা পেশ হওয়ার অনেক আগে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ আরম্ভ হওয়ারও অনেক আগে নাজির ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন।
আমরা নাজির মহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান যে ছবিটি সত্যিই এপ্রিল মাসের। সে দিনই তাঁদের গ্রাম সুখগড়ের বাসস্ট্যান্ডে প্রথম বাস দাঁড়াল বলে তিনি এই সেলফিটি তুলেছিলেন। "বাসের সামনে আরও কয়েক জন গ্রামবাসীর সঙ্গে আমার এই ছবিটি পাঞ্জাবি ট্রিবিউন নামে একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি জানুয়ারি মাসে ছবিটি তুলেছিলাম, এবং ২০২০ সালের ৮ এপ্রিল ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করি। ১২ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে সংবাদপত্রে যে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিও এই রকমই— তাতে গ্রাম পঞ্চায়েতের সব সদস্যকে দেখা যাচ্ছিল।"
নাজির মহম্মদ এই সংবাদ প্রতিবেদনটির কাটিংয়ের ছবি আমাদের দেন। নীচে সেই ছবি দেখা যাচ্ছে।
সংবাদ প্রতিবেদনটি পাঞ্জাবি ভাষায় লেখা। আমরা সেটি অনুবাদ করে দেখি যে মহম্মদের বক্তব্যের সঙ্গে তার সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে নাজির মহম্মদ (বাম দিক থেকে চতুর্থ) অন্যান্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে একটি বাসের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, "গ্রাম থেকে বাস চলাচলের সূচনা উপলক্ষে সুখগড় গ্রাম পঞ্চায়েত মিষ্টি বিতরণ করল।" বাসটি নাজিরের গ্রাম সুখগড় সহ কোন কোন গ্রাম হয়ে যাবে, পথে কোন হাসপাতাল পড়বে, এই তথ্যগুলিও গ্রামবাসীর সুবিধার্থে প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছিল।
সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিটিতেও নাজিরকে ভাইরাল হওয়া ছবির রঙের পাগড়ি ও জামা পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
নাজির মহম্মদ জানান যে সংবাদপত্রের ছবিতে তাঁকে পাগড়ি পরিহিত অবস্থাতেই দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান যে পাঞ্জাব বিদ্যুৎ পর্যদে ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি আরম্ভ করার পর গত দু'বছর যাবৎ তিনি মূলত কাজের প্রয়োজনেই পাগড়ি পরছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, "পর্ষদের নিয়ম হল কাজের সময় হেলমেট পরতেই হবে। কিন্তু হেলমেট পরলে আমার দেখতে অসুবিধা হয়। তাই আমার এক বন্ধু আমায় পাগড়ি পরার পরামর্শ দেন। তিনি আমায় একটি পাগড়ি উপহারও দিয়েছিলেন। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলার পর আমি পাগড়ি পরতে আরম্ভ করি, এবং তার পর থেকে প্রতিদিনই পরেছি।"
নাজির জানান যে তিনি দিল্লিতে চলা কৃষকদের প্রতিবাদকে সমর্থন করেন, কিন্তু সেখানে সশরীরে যাননি।
নাজির স্থানীয় থানায় অভিযোগ নথিভুক্ত করেন। সেই চিঠিতে গ্রামের বহু মানুষ তাঁর সমর্থনে স্বাক্ষর করেছেন। বুম সেই অভিযোগপত্রের একটি কপি জোগাড় করেছে। চিঠিটি নীচে দেখা যাবে।
আমরা প্রো পাঞ্জাব নামে একটি স্থানীয় সংবাদ চ্যানেলের একটি ভিডিওর সন্ধান পাই। চ্যানেলটির প্রতিনিধিরা সুখগড় গ্রামে গিয়ে নাজির মহম্মদের সাক্ষাৎকার নেন। এই ভিডিওতেও নাজিরকে সবুজ পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
Updated On: 2020-12-03T19:41:18+05:30
Claim Review :   ছবি দেখায় মুসলিম নাজির মহম্মদকে শিখ কৃষক সেজে বিক্ষোভে সামিল হয়েছে
Claimed By :  Social Media Posts
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story