করোনাভাইরাসের পেটেন্ট রয়েছে? সোশাল মিডিয়ার পোস্টগুলি কেন বিভ্রান্তিকর

করোনাভাইরাসের পেটেন্টের যে খবর সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে তা কিন্তু চীনে যে নতুন ধরনের ভাইরাস পাওয়া গেছে তার পেটেন্ট সংক্রান্ত নয়।

ইংল্যান্ডের সারে'তে অবস্থিত পিরব্রাইট ইন্সটিটিউটের করোনাভাইরাসের জন্য পাওয়া পেটেন্টের স্ক্রিনশট সমেত যে পোস্টগুলি সোশাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, সেগুলি বিভ্রান্তিকর। কারন চিনের ইউহান জেলায় যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, তা একটি নতুন ভাইরাস, যার উৎস এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই পেটেন্ট আসলে করোনাভাইরাসের পুরানো প্রজাতির উপর পাওয়া, এবং এটি চীনে সাম্প্রতিক ছড়িয়ে পড়া ২০১৯ সালের নতুন করোনাভাইরাস নয়।

২০২০ সালে মার্কিন সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ভি এ শিব আয়াদুরাই পেটেন্টের এমন একটি ছবি পোস্ট করেছেন, যেটি দেখে মনে হয় করোনাভাইরাসের পেটেন্ট ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গিয়েছে। আয়াদুরাই এর আগেও তাঁর ইমেল সংক্রান্ত মন্তব্যের জন্য বিতর্কে জড়িয়েছেন।
তাঁর পোস্টের যে ধরনের রিপ্লাই পাওয়া গেছে তা দেখে মনে হয় বহু ফেসবুক ব্যবহারকারী এই পেটেন্টটিকে চীনে সাম্প্রতিক ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের পেটেন্টের সঙ্গে এক করে ফেলছেন। টিকাকরণের বিরোধী বহু গোষ্ঠী ফেসবুকে এই পেটেন্টকে মার্কিন ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করেছেন।

'করোনাভাইরাস' এবং 'পেটেন্ট' এই কথাগুলি টুইটারে সার্চ করে একটি নতুন অভিযোগ চোখে পড়ছে। অনেকেই এটিকে মানুষের তৈরি ভাইরাস বলে অভিহিত করছেন, এমনকি একে জৈব-অস্ত্র বলেও দাবি করছেন। অনেকেই এর জন্য বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনকে দোষ দিচ্ছেন কারণ এই সংস্থা আগে পিরব্রাইট ইন্সটিটিউটের সঙ্গে কাজ করেছে।

তথ্য যাচাই

যে পেটেন্টের ছবিটি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, তা আসলে ২০১৫ সালে পিরব্রাইট ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে অন্য একটি পুরানো ধরনের করোনাভাইরাসের পেটেন্টের জন্য ফাইল করা হয়েছিল এবং সেটি সাম্প্রতিক ২০১৯-নতুন করোনাভাইরাসের জন্য নয়।

করোনাভাইরাস এমন এক ধরনের ভাইরাস-ফ্যামিলির অংশ, যেগুলো অনেকটাই একে অন্যের মতো দেখতে, কিন্তু জিনগত ভাবে আলাদা। এই ভাইরাসগুলি দেখতে মুকুটের মতো, কিন্তু তাদের জেনেটিক সিকোয়েন্স পরস্পরের চেয়ে আলাদা। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেস্পিরাটরি সিন্ড্রোম (এসএএরএস) এবং মিডল ইস্ট রেস্পিরাটরি সিন্ড্রোম (এমইআরএস) হল কয়েকটি পৃথক করোনাভাইরাসের উদাহরণ।

এই ভাইরাসগুলি পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে চলে যায়, কিন্তু শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় এই ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব নয়।

এই পেটেন্টের পুরো বিষয়টি না পড়েই টুইটার ব্যবহারকারীরা গুগল() এবং জাস্টিয়া পেটেন্ট লিঙ্ক শেয়ার করেছেন। যেখানে এই পেটেন্টের ব্যাকগ্রাউন্ড অংশে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট ধরনের পক্ষিবাহী ইনফেক্সাস ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাসের (আইবিভি) সংক্রমণ কমানোর জন্য এই পেটেন্ট। কমজোরি ভাইরাস থেকে ভ্যাকসিন তৈরী করা হয়। যে সব ভাইরাস শরীরের উপর আক্রমণ করে, এই ধরনের ভাইরাস তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং এগুলি কোনও রোগ ছড়ায় না।

গবেষকরা জানেন এই বিশেষ ধরনের আইবিভি ভাইরাস কাদের থেকে ছড়ায়। মুরগি, তিতির ও টার্কি থেকে এই ভাইরাস ছড়ায় বলে একে বলা হয় এভিয়ান আইবিভি।

আইবিভির সাম্প্রতিক পেটেন্টটি ২০২০ সালে শেষ হবে। পিরব্রাইট ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। সংস্থাটি আইবিভি নিয়ে গবেষণা করেছে, এবং এই ভাইরাসের পেটেন্ট নিয়েছে। পশুদেহে সৃষ্টি হওয়া সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের কাজ করে এই সংস্থাটি।

বিজ্ঞানীরা এখনও চীনে করোনাভাইরাসের উৎসটি চিহ্নিত করতে পারেননি। কিছু গবেষণার অভিমত, যেহেতু ইউহানের সামুদ্রিক জীবের বাজারেই এই ভাইরাসের উৎপত্তি এবং সেখান থেকেই রোগটি ছড়িয়েছে, তাই এই ভাইরাসের উৎস সাপ হতে পারে। আবার অন্য দিকে এই নতুন ভাইরাসের জেনমিক সারণি এবং আরএনএ প্রোটিন বাদুড়ের সঙ্গে মিলে যায়। নিপা থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা, বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস বাদুড় থেকে ছড়ায় বলে জানা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনও এই ভাইরাসের উৎস জানার চেষ্টা করছেন।

অর্থাৎ, এই নতুন ভাইরাসটি মোটেই মনুষ্যসৃষ্ট নয়, এবং এটি জৈবঅস্ত্রও নয়।

করোনাভাইরাসের এই সাম্প্রতিক সংক্রমণের ফলে চীনে ইতিমধ্যেই ৪১ জন মারা গেছেন এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। এই ভাইরাস অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, ম্যাকাও, মালয়েশিয়া, নেপাল, তাইওয়ান, তাইল্যান্ড এবং ইউএসএতে ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: চিনে করোনাভাইরাস: সতর্কতা জারি ভারতে

Updated On: 2020-01-29T12:34:44+05:30
Claim Review :  আমেরিকার কাছে করোনাভাইরাসের পেটেন্ট রয়েছে
Claimed By :  Social Media
Fact Check :  Misleading
Show Full Article
Next Story