পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু: সরকারি পরিসংখ্যান সমগ্র চিত্র তুলে ধরে না

এনসিআরবি ২০১৮ সালে ৭০টি পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর হিসাব দেখালেও, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একই সময়ে ১,৯৬৬টি মৃত্যুর তথ্য দেয়।

তামিলনাড়ুর থুটুকুড়িতে পুলিশি হেফাজতে পি জয়রাজ ও তাঁর ছেলে ফিনিক্স-এর মৃত্যু আবার নতুন করে নাগরিকদের প্রতি পুলিশি নির্যাতনের প্রশ্নটিতে আলোকপাত করেছে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীতে যে-কোনও সংস্কার আনার প্রস্তাব বারবার বানচাল হয়ে গেছে এ বিষয়ে সংগৃহীত ও প্রচারিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানের পার্থক্যে। যেমন এনসিআরবি-র ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৭০, আর ওই একই সময়ের মানবাধিকার কমিশনের সংগৃহীত পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে এনজিও 'নির্যাতন-বিরোধী জাতীয় অভিযান' দেখাচ্ছে, ওই ম-ত্যুর সংখ্যাটি ১৯৯৬। ২০১৯ সালের ক্ষেত্রে ওই মৃত্যুর সংখঅযাটি ১৭২৩।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) অবশ্য ২০১৯ সালের কোনও পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করেনি।

যে পদ্ধতিতে মৃত্যুর ঘটনাগুলি রিপোর্ট করা হয়, তার মধ্যেই এই পরিসংখ্যানগত বৈসাদৃশ্যের হেতু নিহিত রয়েছে। মানবাধিকার কমিশন প্রতি মাসের যে সব মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করে, তার মাসিক হিসাব দাখিল করে, আর এনসিআরবি রাজ্য পুলিশের রিপোর্ট করা ঘটনাগুলির বাত্সরিক খতিয়ানই কেবল নথিভুক্ত করে। ২০১৮ সালের রিপোর্ট করা ৭০টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় এনসিআরবি কেবল ৩টি ক্ষেত্রে পুলিশের মারে বন্দির মৃত্যুর কথা নথিভুক্ত করেছে, সে জায়গায় মানবাধিকার কমিশনের খতিয়ানে পুলিশি ও বিচারবিভাগীয় হেফাজতে বন্দিদের মৃত্যুর মোট হিসাবটিই প্রকাশিত হয়, আলাদা করে বন্দির মৃত্যুর কারণ হিসাবে পুলিশি অত্যাচার, আত্মহত্যা বা অসুস্থতা ইত্যাদি কারণ সেখানে নির্দেশ করা হয় না।

জয়রাজ ও ফিনিক্স-এর একটি মোবাইল ফোনের দোকান ছিল, যেটি লকডাউনের সময় নির্ধারিত সময়ের পরেও খোলা রাখা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে একটা মতবিরোধ হয়। জয়রাজ এ সময় পুলিশের সমালোচনা করলে দুজনকেই পুলিশ থানায় নিয়ে যা। অভিযোগ—এরপর পুলিশ তাদের দুজনকে এমন পেটায় যে তারা লক-আপের ভিতরেই মারা যায়| একাধিক সংবাদ-প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে পুলিশ এই দুজনের ওপরেই অকথ্য অত্যাচার চালায় এবং তাদের ওপর যৌন নির্যাতনও করে।

অতি সম্প্রতি রাজ্যে আরও একটি ঘটনায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে l টেনকাশি জেলায় কাইতেরাসান নামে এক অটো-চালক পুলিশি নিগ্রহে মারা যায়। তার পরিবারের অভিযোগ, ২০ দিন আগে সম্পত্তি নিয়ে এক বিবাদের জেরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার পর তার ওপর এমন অত্যাচার চালানো হয় যে, সে মারা যায়।

গত ২২ জুন গুজরাতের সুরাটে কানাড়া ব্যাঙ্কের একটি শাখায় এক উর্দি-হীন পুলিশ কনস্টেবল ঘনশ্যাম শিভারে ব্যাংকে ঢুকে এক মহিলা কর্মীকে এমন অত্যাচার করে যে স্বয়ং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়| শিভারেকে সেই থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে|
ঘটনাচক্রে এনসিআরবি-র পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে গুজরাট ও তামিলনাড়ুতেই পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যথাক্রমে ১৪ এবং ১২, যদিও প্রতিটি মৃত্যুই যে পুলিশি অত্যাচারের জন্য ঘটেছে, এমন কথা স্বীকার করা হয়নি|

আর এ ভাবেই এনসিআরবি-র পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়|

মানবাধিকার কমিশনের বিকল্প পরিসংখ্যান
অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যানের এই তারতম্য একই রকম| ২০১৮ সালে যেমন এনসিআরবি দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটিও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেনি, যদিও এনসিএটি-র নিজস্ব তদন্তে এই সব রাজ্য থেকেই একাধিক হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। তাদের ২০১৮-র রিপোর্টটি এখানে দেখুন।
এনসিএটি-র পরিচালক সুহাস চাকমা বুমকে জানালেন: "এনসিআরবি শুধু সেটুকুই রিপোর্ট করে যেটুকু রাজ্যের পুলিশ তাদের জানায়, নিজেরা এর বাইরে গিয়ে কোনও অনুসন্ধানই করে না। কিন্তু এনসিএটি তার তথ্য সংগ্রহ করে মানবাধিকার কমিশনের হিসাব থেকে, যারা প্রতি মাসের পুলিশি নিগ্রহ-মৃত্যুর হিসাব রাখে।" এ ব্যাপারে বুম আইনজীবী মাজা দারুওয়ালার সঙ্গেও যোগাযোগ করে, যিনি মানবাধিকার কমিশনের তরফে পুলিশি সংস্কার বিষয়ক নজরদার হিসাবে নিযুক্ত। তিনিও আমাদের জানান, এনসিআরবি যেখানে কেবল রাজ্যগুলির পুলিশ প্রশাসনের সরবরাহ করা তথ্যটুকুই হিসাবে নেয়, তাঁরা সেখানে মানবাধিকার কমিশন অনুসৃত অভিযোগ ও মামলাগুলিরও পর্যবেক্ষণ করেন।

২৬ জুনে(নির্যাতনের শিকারদের প্রতি সংহতির আন্তর্জাতিক দিবসে)এনসিএটি জানায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১৭২৭টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ গড়ে দিনে ৫টি করে| তার মধ্যে ১৬০৬টি মৃত্যু ঘটে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে, আর ১১৭টি পুলিশ হেফাজতে।

সুহাস চাকমা বুমকে জানালেন যে, তাঁরা হেফাজতে মৃত্যুর প্রকৃত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁদের তথ্য সংকলন করেন। ২০১৯ সালে এনসিএটি নিজেরাই পুলিশি হেফাজতে এ ধরনের ১২৫টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে থাকা পাঁচটি রাজ্য হলো উত্তরপ্রদেশ (১৪টি), তামিলনাড়ু ও পাঞ্জাবে ১১টি করে, বিহার ও মধ্যপ্রদেশে ৯টি করে, গুজরাটে ৮টি এবং দিল্লি এবং ওড়িশায় ৭টি করে। এই ১২৫টি হেফাজত মৃত্যুর মধ্যে ৯৩টি (৭৪.৪ শতাংশ) পুলিশি নির্যাতনের কারণে। একই রিপোর্টে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আরও ৪০টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে, যেগুলি নির্যাতনের কারণে ঘটেছে।

মাজা দারুওয়ালা ব্যাখ্যা করলেন: "হেফাজতে থাকা ব্যক্তির ভালমন্দের ভার সম্পূর্ণভাবে কর্তৃপক্ষের, তাই হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে তার জবাবদিহি করার দায়ও একান্তভাবে সেই কর্তৃপক্ষের উপরেই বর্তায়।"

মানবাধিকার কমিশনের পরিসংখ্যান শুধু যে এনসিএটি-ই ব্যবহার করে, তা নয়। ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই লোকসভায় হেফাজতে মৃত্যুর উপর একটি প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও কমিশনের নথিভুক্ত পরিসংখ্যানই উদ্ধৃত করেছে, যা আবার এনসিএটি-র পরিসংখ্যানের খুব কাছাকাছি।
এনসিএটি-র 'অত্যাচারের উপর ২০১৯ সালের বার্ষিক রিপোর্টটি' এখানে
দেখতে পারেন।
কী করা হচ্ছে?

নির্যাতনের উপর ২০১৮ সালের বার্ষিক রিপোর্টে খেদ প্রকাশ করা হয়েছে যে, ভারত এখনও ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে সম্পাদিত রাষ্ট্রপুঞ্জের এ সংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর দেয়নি। এই সনদ একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষার চুক্তি, যা সারা বিশ্বে সর্বত্র মানুষকে অমানবিক আচরণ, অত্যাচার এবং শাস্তি থেকে রক্ষা করতে চায়।

এই সনদের চতুর্থ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী প্রতিটি দেশকে নাগরিকদের উপর অত্যাচার চালানো ও অমানবিক আচরণ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে আইন প্রণয়ন করতে হবে।

২০১০ সালে ভারতের লোকসভায় অত্যাচার-নিরোধক বিল পাশ হয়, কিন্তু রাজ্যসভায় তা পাশ করানো হয়নি এবং ২০১৪ সালে লোকসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিলটি নাকচও হয়ে যায়। ২০১৭ সালে আইন কমিশন এই বিলের একটি নিজস্ব সংস্করণ পেশ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট দেশের ২৮টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারকে বিলটি বিষয়ে তাদের মতামত জানাতে বলে, যা তখনও পর্যন্ত তারা জানিয়ে উঠতে পারেনি।

এনসিআরবি-র ২০১৮ সালের রিপোর্টটি এখানে পড়তে পারেন আর মানবাধিকার কমিশনের মাসিক হেফাজতে মৃত্যুর রিপোর্টটি এখানে দেখে নেওয়া যেতে পারে।

আপনাকে যদি গ্রেফতার করে হেফাজতে নেওয়া হয়, তাহলে আপনার কী কী অধিকার থাকবে? উত্তর পেতে দেখুন আইনজীবী এবং মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুধা রামলিঙ্গমকে করা বুম-এর গেবিন্দরাজ এথিরাজ-এর এই সাক্ষাৎকার

Updated On: 2020-08-20T11:16:47+05:30
Show Full Article
Next Story