মেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে বোমা রেখে ধৃত বলে ভাইরাল হল বিজেপি কর্মীর ছবি

বুম দেখে ছবিটি বিজেপির দক্ষিণ কন্নড় তথ্য-প্রযুক্তি সেল-এর সদস্য সন্দীপ লোবোর, ধৃত অভিযুক্তের নয়।

বিজেপির সদস্য এক ব্যবসায়ীর ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া পোস্টে শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, ছবির ব্যক্তিটিই মেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে বোমা রাখার দায়ে ধৃত ব্যক্তি। কিন্তু বুম দেখেছে, ভাইরাল ছবির ব্যক্তিটি আরএসএস-বিজেপির সক্রিয় একজন সদস্য। আর ধৃত আদিত্য রাও একজন চিহ্নিত অপরাধী, যে এর আগেও ভুয়ো টেলিফোন ফোন করার অভিযোগে দোষী।

বুম মেঙ্গালুরু পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায় যে, এই দুইজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, একই লোক নয়। আর লোবোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এই ভুয়ো পোস্টের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন। তাঁর কথায়, "পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে, সে আমি নই। আমি বিজেপি ও আরএসএস-এর একজন সক্রিয় সদস্য।" সোমবার বিমানবন্দরে তিনিই বোমা রেখেছিলেন, আদিত্য রাও একথা স্বীকার করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করার পর বুধবার থেকেই এই পোস্ট সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে থাকে। বর্তমানে মেঙ্গালুরু পুলিশের হেফাজতে থাকা আদিত্য অতীতেও মেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বোমা রাখার ভুয়ো হুমকি দিয়ে
গ্রেফতার হয়েছিলেন
ভাইরাল পোস্ট

ভাইরাল হওয়া পোস্টে এক ব্যক্তিকে আরএসএস-এর উর্দি পরে দেখা যাচ্ছে এবং অন্য কিছু ছবিতে ওই একই ব্যক্তিকে বিজেপি নেতা তেজস্বী সূর্যের সঙ্গেও দেখা গেছে।

পোস্টটি আর্কাইভ করা আছে এখানে
ক্যাপশনে কোথাও তাকে "মানসিক ভারসাম্যহীন আদিত্য রাওকে তার গুরু ও আরএসএস শিক্ষক প্রভাকর ভট্টের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে" বলে লেখা হয়েছে। আর একটি পোস্টে লেখা হয়েছে: "আরএসএস কখন বলবে আদিত্য রাও গত সপ্তাহে আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছেন, সে জন্য অপেক্ষায় আছি।" অন্য একটি পোস্ট লিখছে, মেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে বোমা রাখার দায়ে ধৃত আদিত্য রাও তেজস্বী সূর্য এবং প্রভাকর ভট্টের ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইত্যাদি।

তথ্য যাচাই

বুম দেখেছে, ভাইরাল হওয়া পোস্টের ছবিটি ধৃতের ছবির সঙ্গে মিলছে না। পোস্টের ছবিটি সন্দীপ লোবোর, যিনি পুত্তুর-এর এক ব্যবসায়ী। আরএসএস-এর সক্রিয় সদস্য লোবো বিজেপির দক্ষিণ কন্নড় তথ্য-প্রযুক্তি সেলের সঙ্গে কাজও করেন।

আমরা লোবোর ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে দেখেছি, ভাইরাল হওয়া ফোটোগুলি সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছে। ওই সব ছবিতেই বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যের সঙ্গেও তাঁকে দেখা গেছে। লোবো এক বিবৃতিতেও জানিয়েছেন। বিবৃতি দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ধৃত সন্ত্রাসবাদীর ছবি বলে যা প্রচার হচ্ছে, সেটা তিনি নন।

লোবো দক্ষিণ কন্নড় বিজেপি শাখার হ্যান্ডেল থেকে আরও একটি পোস্ট দিয়েছেন, যেখান তাকে থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করতে দেখা যাচ্ছে। তিনি পুত্তুর জেলার পুলিশের কাছে এবং বিজেপির শাখাতেও এই অভিযোগ পাঠিয়ে দিয়েছেন। পোস্টে তার অভিযোগপত্রের প্রতিলিপিও দেওয়া হয়েছে, যার একটি কপি তিনি বুম-এর কাছেও পাঠিয়েছেন।

আমরা লোবোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, "প্রথম এই পোস্টটির দিকে নজর পড়ে ফেসবুকেই। আমারই এক বন্ধু পোস্টটি দেখে তাতে আমাকে ট্যাগ করে, যাতে লেখা আছে, মেঙ্গালুরু বিমাবন্দরে বোমা রাখার দায়ে ধৃত ব্যক্তিটি নাকি আমিই এবং আমার একটি ছবিও নাকি পোস্টে ছাপা হয়েছে। অনুসন্ধান চালিয়ে আমি দেখি, যে আমার ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকী হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপের মধ্যেও। এর ভিত্তিতেই লোকে আমার, আরএসএস এবং বিজেপির উদ্দেশ্যে নানা বার্তা পোস্ট করে চলেছে" তিনিই আমাদের জানান যে, তিনি আরএসএসের একজন সক্রিয় কর্মী এবং বিজেপির দক্ষিণ কন্নড় তথ্য-প্রযুক্তি সেল-এর সদস্য।

আমরা মেঙ্গালুরু পুলিশের কাছে পোস্টের ছবি পাঠিয়ে জানতে চাই, এটাই ধৃত সন্ত্রাসীর ছবি কিনাl নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অফিসার আমাদের জানান, না, ইনি সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তি নন। "আমরা ভাইরাল হওয়া ছবিটা দেখেছি। ইনি সেই ধৃত ব্যক্তি নন। তা ছাড়া, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ধৃতের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সংশ্রব নেই এবং সে আগেও এ ধরনের অপরাধ করেছে। আমাদের সন্দেহ, কারও ওপর রাগ থেকেই সে এটা করেছে। আমরা তার মানসিক স্বাস্থ্যও পর্যবেক্ষণ করছি।"

সংবাদসংস্থা এএনআই ধৃতের একটি ছবি ছেপেছে এবং আমরা দেখেছি, দুজনের ছবির মুখে কোনও মিল নেই।

অভিযুক্ত আদিত্য রাও এখন মেঙ্গালুরু পুলিশের হেফাজতে।

মহেশ হেগড়ে ঘটনাটিতে সাম্প্রদায়িক রঙ চড়াচ্ছেন

ঘটনাটি আরও অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। ভুয়ো খবরের ওয়েবসাইট পোস্টকার্ড নিউজ-এর প্রতিষ্ঠাতা মহেশ হেগড়ে টুইট করেছেন, জেহাদিরা ম্যাঙ্গালোরকে ধ্বংস করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে ভুয়ো খবর ছড়ানোর দায়ে ইতিপূর্বে গ্রেফতার হওয়া মহেশ হেগড়ের বক্তব্য: "কয়েকদিন আগেই জেহাদিরা মেঙ্গালুরু শহরটাকেই প্রায় পুড়িয়ে দিচ্ছিল। এখন বিমানবন্দরেও একটা তাজা বোমা উদ্ধার হলোl কয়েকজন বিশ্বাসঘাতকের জন্য জেহাদিরা আরও ক্ষমতা অর্জন করছেl কিন্তু পুলিশ যদি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তখন রাজনীতিকরা তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসছে।"

অনেক টুইটার ব্যবহারকারীরা মহেশ হেগড়ের এই ভুয়ো খবরের জবাব দিয়েছেন। কিছুকাল আগেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ ভুয়ো খবর ও টুইট প্রচারের দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আমরা মহেশ হেগড়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি, তার জবাব পেলেই প্রতিবেদনটি সংস্করণ করা হবে।

কয়েকটি সংবাদ-রিপোর্টে অভিযুক্তকে আদিত্য রাও বলেই শনাক্ত করা হয়েছে। মেঙ্গালুরু পুলিশের প্রশ্ন: ''অভিযুক্তের ধর্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে যাবে? এ ধরনের প্রশ্নের জবাব আমরা দেব না।''

আরও পড়ুন: দিল্লির ভোটারদের ঘুষ দিতে গিয়ে এক বিজেপি প্রার্থী ভিডিওতে ধরা পড়ল?

Updated On: 2020-01-28T11:06:01+05:30
Show Full Article
Next Story