ফ্রান্সে শিরোচ্ছেদ প্রসঙ্গে রানা আয়ুবের ভুয়ো সম্পাদিত মন্তব্য ভাইরাল

বুম দেখে ‘মাত্র দুটি শিরচ্ছেদের ঘটনায় সব মুসলমানকে ঘৃণা করা যায় না' লেখা স্ক্রিনশটটি সম্পাদনা করে বানানো হয়েছে।

এক সংবাদ প্রতিবেদনের স্ক্রিনগ্র্যাবের সম্পাদিত একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে যে সাংবাদিক রানা আয়ুব ফ্রান্সে শিরচ্ছেদের ঘটনাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং এই হিংসার পক্ষে যুক্তি খাড়া করেছেন।

বুম যাচাই করে দেখে, সিএনএন-এর যে অনুষ্ঠানটিতে আয়ুব উপস্থিত ছিলেন, এবং যার স্ক্রিনগ্র্যাব সম্পাদিত হয়েছে, সেটি ২০২০ সালের মার্চ মাসের। সেই অনুষ্ঠানে রানা দিল্লির দাঙ্গা বিষয়ে কথা বলেছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে সেই দাঙ্গাটি সংঘটিত হয়। ফ্রান্সের ঘটনায় রানার মন্তব্য বলে যে কথাটি এই ভাইরাল মেসেজে প্রচারিত হচ্ছে, তা ছবিটি সম্পাদনা করে ঢোকানো হয়। রানা আয়ুব নিজেও টুইটারে জানিয়েছেন যে এই ছবিটি ভুয়ো।
ফ্রান্সে সম্প্রতি একাধিক ঘটনায় ইসলামীয় মৌলবাদীরা হিংস্রতার আশ্রয় নিয়েছে। নবী হজরত মহম্মদের অসম্মান হয়, এমন ছবি দেখানোর জন্য স্যামুয়েল প্যাটি নামক এক স্কুল শিক্ষককে হত্যা করে এক উগ্রবাদী। প্যাটি তাঁর ক্লাসে বাক্-স্বাধীনতার উদাহরণ হিসেবে এই ছবিটি দেখিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ২৯ অক্টোবর নাইসে এক আততায়ী নত্রা দাম ব্যাসিলিকার সামলে এক মহিলাদের ছুরি নিয়ে আক্রমণ করে ও তাঁর মাথা কেটে নেয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ এই ইসলামি উগ্রপন্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন, একে জঙ্গি হানা বলে অভিহিত করেছেন এবং বাক্-স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছেন। প্রতিবাদে গোটা বিশ্বের বহু মুসলমান সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছেন। এই পটভূমিকাতেই রানা আয়ুবের ভুয়ো উদ্ধৃতিটি ভাইরাল হল।
রানা আয়ুবের ভুয়ো বিবৃতি সমেত যে ছবিটি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে, তার ক্যাপশনে রানার সমালোচনা করা হয়েছে তো বটেই, তাঁকে ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছে, "মানুষের উচিত অন্তত ২-৩ কোটি শিরশ্ছেদের জন্য অপেক্ষা করা। চরস গাঁজা আমার প্রিয়— রানা আয়ুব।" এই পোস্টটিতে রানার যে ছবি দেখা যাচ্ছে, তার জন্য একটি নিউজ টিকারও রয়েছে, যাতে লেখা— "মাত্র দুটি শিরচ্ছেদের ঘটনার জন্য সব মুসলমানকে ঘৃণা করা যায় না।"
এমন কিছু পোস্টও শেয়ার করা হচ্ছে যাতে দাবি করা হয়েছে যে এই সম্পাদিত ভুয়ো ছবিটি আসলে স্যাটায়ার।
দেখার জন্য এখানেও আর্কাইভের জন্য এখানে
ক্লিক করুন।


দেখার জন্য এখানে ও আর্কাইভের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

তথ্য যাচাই

বুম অনুসন্ধান করে দেখল, যে স্ক্রিনগ্র্যাবটি ভাইরাল হয়েছে সেটি সম্পাদিত, এবং সিএনএন-এর আসল দৃশ্যটিতে এই রকম কোনও নিউজ টিকার ছিল না। এই স্ক্রিনশটটি সিএনএন-এ পয়লা মার্চ ২০২০ তারিখে সম্প্রসারিত ফরিদ জাকারিয়ার অনুষ্ঠান থেকে নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ ফ্রান্সে হামলার বহু আগে।

তা ছাড়াও, দিল্লি দাঙ্গা নিয়ে মন্তব্য করার সময় রানা আয়ুব শিরশ্চেদ নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।

যে সম্পাদিত স্ক্রিনগ্র্যাবটি ভাইরাল হয়েছে, তার নিউজ টিকারে লেখা রয়েছে, "মাত্র দুটি শিরশ্ছেদের ঘটনায় সব মুসলমানকে ঘৃণা করা যায় না।" অনুষ্ঠানটি চলার সময় পর্দায় আসল যে নিউজ টিকারটি ছিল, তাতে লেখা ছিল, " দিল্লিতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক হিংসায় বহু মানুষের মৃত্যু।"

১ মার্চ, ২০২০ তারিখে সিএনএন যে টুইটটি করেছিল, তার ১ মিনিট ৯ সেকেন্ড টাইমস্ট্যাম্পে আসল টিকারটি দেখা যাবে।

সিএনএন-এর ওয়েবসাইটে পাঁচ মিনিট পনেরো সেকেন্ড দৈর্ঘের গোটা সেগমেন্টটিই দেখা যাবে। ভাইরাল মেসেজটিতে যেমন দাবি করা হচ্ছে, এই ক্লিপটির কোথাও রানা আয়ুবকে তেমন কোনও মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। (দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লির উত্তর-পূর্ব অংশে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, এই ক্লিপে সে বিষয়ে আলোচনা শোনা যাবে।

আয়ুব নিজেও টুইট করে জানান, তাঁর ছবিসমেত যে স্ক্রিনগ্র্যাবটি ঘুরছে, তা আদ্যন্ত ভুয়ো। তাঁর নামে যে উদ্ধৃতি সেখানে দেওয়া হয়েছে, সেটিও মিথ্যে। আয়ুব এই ছবিটিকে মর্ফড বলেন এবং দাবি করেন যে তিনি এই ভ্রান্ত তথ্যের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

তুলনা

ভুয়ো স্ক্রিনগ্র্যাবটিতে আয়ুবের নামের বানানটি ভুল লেখা হয়েছে— ইংরেজি তিনি Ayyub লেখেন, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে Ayub। নিউজ টিকারেও ব্যাকরণগত ও অন্যান্য ভুল রয়েছে।

আসল ও ভুয়ো স্ক্রিনগ্র্যাবের মধ্যে কিছু তুলনা নীচে দেওয়া হল।

তুলনা

ভাইরাল হওয়া ছবিটিতে ফ্রান্সের আক্রমণের ঘটনা নিয়ে রানার উদ্ধৃতি বলে যে কথাগুলি লেখা হয়েছে, রানার তেমন কোনও বিবৃতির সন্ধান আমরা পাইনি।

ফ্রান্সে শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটিকে হত্যা করার পর বিভিন্ন অসম্পর্কিত ভিডিও ও ছবি কিছু মিথ্যে দাবিসমেত ভাইরাল হয়েছিল। বুম ইতিপূর্হে সেগুলির তথ্য যাচাই করেছে।

Claim Review :   রানা আয়ুব সিএনএন চ্যানেলে বলেছেন কেবল দুটি শিরোশ্ছেদের জন্য সব মুসলিমকে দোষারোপ করা যায়না
Claimed By :  Facebook Posts
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story