মিথ্যে: করোনাভাইরাস তৈরি করার জন্য গ্রেপ্তার হলেন হার্ভার্ডের অধ্যাপক

হার্ভার্ডের একজন জৈব রসায়ণ ও ন্যানো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীর গ্রেপ্তার হওয়ার সত্য ঘটনাকে বিভ্রান্তিকর দাবি সহ ভাইরাল করা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস (ডিওজে) দ্বারা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যায়ের ড. চার্লস লিবারের গ্রেপ্তারির ঘটনাকে সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাবে শেয়ার করা হচ্ছে বিভ্রান্তিকর দাবির সাথে। ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে, প্রফেসর লিবার'কে চিনের সাথে যোগসাজস করে কৃত্রিম উপায়ে করোনাভাইরাস তৈরি করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুম দেখেছে ভাইরাল হওয়া পোস্টের দাবি বিভ্রান্তিকর। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিওজে দ্বারা হার্ভার্ডের জৈবরসায়ন ও ন্যানো-বিজ্ঞানের গবেষকের গ্রেপ্তারের ঘটনার সত্যতা আছে। কিন্তু এই গ্রেপ্তারের কারন ছিল ভিন্ন, চিন সরকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সম্পর্কে মিথ্যে জবানবন্দি দেওয়া ও চিনের আর্থিক অনুদানের কথা গোপন করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে কৃত্রিমভাবে নভেল করোনাভাইরাস সংশ্লেষণের কোনও সম্পর্ক নেই।

ড. লিবারের গ্রেপ্তারি সংক্রান্ত একটি ভিডিও এবং একটি লেখা (নীচে সংযোজন করা হয়েছে) বুমের হেল্পলাইনে তথ্য যাচাইয়ের আসে। ভিডিওটি দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সেটি এবিসি-র সঙ্গে যুক্ত ইন্টারনেট চ্যানেল ডাব্লিউসিভিবি-র একটি রিপোর্ট।


বুম দেখতে পায় ভিডিওটি ইউটিউব আর ফেসবুকে শেয়ার করা হচ্ছে। ভিডিওর সঙ্গে ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, কৃত্রিমভাবে নভেল করোনাভাইরাস সংশ্লেষ করার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিবারকে আমেরিকাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বিভ্রান্তিকর এই ভিডিওটি ২.৮ লক্ষ বার দেখা হয়েছে।


আরও পড়ুন: কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ভারত সরকারের স্তুতিতে এক মার্কিন সিইওর আঁকা ম্যাপ?

তথ্য যাচাই

বুম তথ্যের অনুসন্ধান করে ভাইরাল হওয়া ডাব্লিউসিভিবি-র রিপোর্টটির খোঁজ পায়। বুম দেখে, শেয়ার-করা ভিডিওটি ওই চ্যানেলেরই রিপোর্ট। বুম তারপর সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখে। ভিডিওতে চিনের সঙ্গে ড. লিবারের গোপন আঁতাত থাকার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এ কথা বলা আছে। কিন্তু গোটা রিপোর্টটিতে করোনাভাইরাসের কোনও উল্লেখ নেই।

ভিডিওটির শিরোনাম বা ক্যাপশনেও ওই ভাইরাস বা কোনও জৈব-অস্ত্রের কথা বলা হয়নি।

বুম এই গ্রপ্তারি নিয়ে ডিওজে-র প্রেস বিজ্ঞপ্তির সন্ধান করে। সেখানে বলা হয়, "মিথ্যে, কাল্পনিক ও প্রতারণামূলক বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।" অন্যদিকে, এই বিজ্ঞপ্তিতে ইয়াকিং ইয়ে ও ঝাওসঙ্গ ঝেঙ্গ, এই দু'জন চিনা নাগরিকের গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আনা হয় একাধিক অভিযোগ, যার মধ্যে ছিল ভিসা জালিয়াতি এবং জীববিদ্যা গবেষণার নমুনা সহ ২১ টি শিশি চিনে পাচার করার ষড়যন্ত্র ও চেষ্টা।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিটিতে আরও বলা হয়, "হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অগোচরে রেখে, ২০১১ থেকেই ড. লিবার চিনের উহান ইউনিভারসিটি অফ টেকনলজির 'স্ট্র্যাটেজিক সায়েনটিস্ট' (বিশেষ কৌশলগত বিজ্ঞানী) হয়ে ওঠেন। এবং চিনের 'থাউজ্যান্ড ট্যালেন্ট প্ল্যান'-এর (এক হাজার মেধার পরিকল্পনা) অংশগ্রহণকারীও ছিলেন তিনি। সেখানে আরও বলা হয় যে, উহান ইউনিভারসিটি অফ টেকনলজি তাঁকে মাসে ৫০,০০০ ডলার দিত এবং উহানে একটি গবেষণাগার তৈরি করার জন্য তাঁকে দেওয়া হয় ১.৫ মিলিয়ন(১৫ লক্ষ) ডলার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র জোনাথান এল সোয়েইন ছাত্রদের সংবাদপত্র 'দ্য হারভার্ড ক্রিমসন' কে বলেন যে, লিবারের ঘটনার ব্যাপারে ইউনিভারসিটি নিজস্ব তদন্ত শুরু করছে।

যদিও হার্ভার্ডের বিজ্ঞান গবেষকের এই গ্রেপ্তারের বাস্তব ঘটনা এবং তার সাথে চিনের যোগ থাকার ব্যাপারটা পুরো ঘটনাকেই সোশাল মিডিয়ায় ভাসতে থাকা এসএআরএস সিওভি-২ ভাইরাসের উৎপত্তির গল্পের সাথে খাপ খেয়ে যায়। কিন্তু ওই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিওজে'র প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কোথাও কোনও ভাইরাস বা অতিমারি সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রের উল্লেখ নেই।

আরও পড়ুন: বাদুড়-সঙ্গমে মানুষের মধ্যে ছড়ায় কোভিড-১৯ দাবির মূলে একটি ভুয়ো ওয়েবসাইট

জৈব অস্ত্র নয়

এসএআরএস সিওভি-২ এর উপরে হওয়া দুটি সাম্প্রতিকতম গবেষনা (ঝাউ ও অন্যান্যরা: ২০২০; অ্যান্ডারসন ও অন্যান্যরা ২০২০) যা পিয়ার রিভিউর পর নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই বিজ্ঞানলব্ধ গবেষনা দুটি ঘেঁটে বুম নিশ্চিত হয় যে এই নভেল করোনাভাইরাস কোনো গবেষণাগারে সংশ্লেষ করা হয়নি। প্রকৃতিতে করোনাভাইরাসের আরও ৬ টি প্রজাতি আছে, যার মধ্যে তিনটি মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। নভেল করোনাভাইরাসের জৈবরাসায়নিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানিরা বলেছেন এটা ইচ্ছেকৃতভাবে বানানোর সম্ভাবনা খুবই নগন্য, তাদের মতামত অনুযায়ী এই নোভেল করোনাভাইরাস প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেই এতটা মারন রুপ ধারন করেছে।

গবেষনাণাপত্রগুলিতে এই নভেল করোনাভাইরাসের ভাইরাসের দু'টি সম্ভাব্য উৎসের কথা বলা হয়েছে,

  1. নভেল করোনাভাইরাসটি কোনও একটি প্রাণীর (বাদুড় বা বন্যরুইয়ের কথাই বলা হয়েছে) মধ্যে ছিল যা প্রকৃতিতে ভাইরাসের পূর্বধারক রুপে কাজ করত। ক্রমে ঐ ধারক প্রানীর দেহে এই ভাইরাসের জিনগত কিছু বিবর্তন হয়। এবং ক্রমে প্রাকৃতিক নিয়মেই এই ভাইরাস নিজেদের ধারক পরিবর্তন করে প্রাণী থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে।
  2. প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করায় ভাইরাসের জিনের গঠনে আবার কিছু পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে ভাইরাসটি অতিমারি সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করে।

বিস্তারিত গবেষণা হওয়া সত্ত্বেও এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি যা প্রমাণ করে যে, ভাইরাসটি কৃত্রিমভাবে মানুষের হাতে তৈরি।

আরও পড়ুন: মিথ্যে: চিনা গোয়েন্দা আধিকারিক জানিয়েছেন করোনাভাইরাস একটি জৈব অস্ত্র

Updated On: 2020-04-21T19:14:41+05:30
Claim :   হার্ভার্ডের গবেষক চার্লস লিবের গ্রেপ্তার হলেন চীনের আঁতাতে করোনাভাইরাস বানিয়ে
Claimed By :  Facebook Posts &YouTube Video
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story
Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors.
Please consider supporting us by disabling your ad blocker. Please reload after ad blocker is disabled.