লকডাউন ভাঙায় পূজারীর বিরুদ্ধে রেওয়া পুলিশের পদক্ষেপে লাগলো সাম্প্রদায়িক রঙ

সাম্প্রদায়িক পোস্টের শিকার হওয়া পুলিশ সুপার আবিদ খানের সঙ্গে বুম কথা বলেছে।

কার্ফিউ এবং লকডাউনের নির্দেশ অগ্রাহ্য করার দায়ে রেওয়া-র এক মন্দির পুরোহিতের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশ পুলিশের ব্যবস্থাগ্রহণ সোশাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে ভাইরাল করা হয়েছে। ভুয়ো অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে, নিগ্রহকারী পুলিশ ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের এবং পুরোহিত সে সময় মন্দিরে একাই ছিলেন।

বুম রেওয়া পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে, যে পুলিশ অফিসার ওই পুরোহিতকে মারধর করেন, তাঁর নাম ইনস্পেকটর রাজকুমার মিশ্র এবং তিনি পুরোহিতকে পেটান যখন লকডাউন অমান্য করে দুশোর বেশি লোক রামনবমীর পুজো উপলক্ষে মন্দিরে সমবেত হয়েছিল। রেওয়া জেলার পুলিশ সুপার আবিদ খান জানান, "সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারটির এ ভাবে পুরোহিতকে নিগ্রহ করার কোনও প্রয়োজন ছিল না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণও করা হয়েছে। অন্য দিকে পুরোহিতও তাঁর আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, লকডাউনের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে এত লোককে মন্দিরের পুজো উপলক্ষে জড়ো হতে দেওয়া তাঁর তরফে অনুচিত হয়েছে।"
অথচ সোশাল মিডিয়ার ভুয়ো খবর ছড়ানো পোস্টগুলিতে আবিদ খানের নামটাই পুরোহিতের নিগ্রহকারী হিসাবে প্রচার করা হয়েছে। সিভিল লাইন্স পুলিশ স্টেশনের স্টেশন হাউস অফিসার রাজকুমার মিশ্র লাঠি দিয়ে পুরোহিতকে পেটাচ্ছেন, এমন এক গুচ্ছ ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দাবি করা হয়েছে, নিগ্রহকারী ওই অফিসারই নাকি আবিদ খান! ফেসবুক, টুইটার ও হোয়াটসঅ্যাপে ভাইরাল হওয়া পোস্টগুলিতে গোটা ঘটনাটার একটা সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে এই বলে যে, নিগ্রহকারী অফিসার একজন মুসলিম এবং তিনি জুতো পরেই মন্দিরে প্রবেশ করে পুরোহিতকে পেটাচ্ছেন।
হিন্দিতে লেখা ওই পোস্টগুলির অনুবাদ এ রকম: "পুলিশ সুপার আবিদ খান এক মন্দিরে ঢুকে এই পুরোহিতকে মারধর করেন যখন তিনি সম্পূর্ণ একা দেবতার পূজার্চনা করছিলেন। মন্দিরের সব জিনিসপত্র তিনি লাথি মেরে ছড়িয়ে দেন, যদিও পুরোহিত তাঁকে বারবার অনুরোধ করছিলেন যে, এটা নবরাত্রির শেষ দিন এবং তিনি কেবল প্রদীপ জ্বালতেই মন্দিরে এসেছেন।"
(হিন্দিতে মূল পোস্ট: रीवा के मन्दिर में अकेले पूजा कर रहे पुजारी को #SP_आबिद_खान ने बेरहमी से मारा. पैरों से फेंक दिया जल और बूटों से कुचला पूजा स्थल. चीखता रहा पुजारी- "मां के नवरात्रि का अंतिम दिन है., दीपक जलाने आया हूँ साहब")
বুম এ নিয়ে জেলার পুলিশ সুপার আবিদ খানের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, এটা স্থানীয় থানার পুলিশের কাজ। তিনি বলেন—আমি সে সময় মন্দিরে ছিলামও না। ঘটনাটি ১ এপ্রিল রাতের যখন ঢেকাহা এলাকার ওই মন্দিরে রামনবমী উপলক্ষে স্থানীয় ভক্তরা জড়ো হয়েছিলেন।

ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, "সিভিল লাইন্স পুলিশ স্টেশনের স্টেশন হাউস অফিসার একটা খবর পান যে, প্রায় শদুয়েক লোক ওই মন্দিরে জড়ো হয়েছে। অফিসার রাজকুমার মিশ্র তখন একদল পুলিশ নিয়ে মন্দিরে পৌঁছন। পুলিশ দেখেই সমবেত জনতা দৌড়ে পালাতে থাকে। রাগের চোটে তখন মিশ্র পুরোহিতের হাতের দণ্ডটা কেড়ে নিয়ে তা দিয়েই তাঁকে মারতে থাকেন।"

সুপার আবিদ খান জানান, "মন্দিরের ভিতর পুলিশের ওই আচরণ অন্যায় এবং অপ্রয়োজনীয় ছিল। আমরা ওঁর বিরুদ্ধে তদন্তও শুরু করেছি। তদন্তের ফলাফল না জানা পর্যন্ত অফিসার মিশ্রকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারিতও করা হয়েছে।

অথচ সোশাল মিডিয়ায় বেশ কয়েকজন শেয়ার করেছেন যে, আবিদ খানই সেই পুলিশ অফিসার, যিনি এই অপকর্মটি ঘটিয়েছেন। শেয়ারকারীদের মধ্যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের জাতীয় মুখপাত্র বিজয়শংকর তেওয়ারির যাচাই-করা টুইটার হ্যান্ডেলও রয়েছে।

অতীতে অনেকবার সাম্প্রদায়িক পোস্ট শেয়ার করে ভুয়ো খবর ছড়ানোয় সিদ্ধহস্ত সুদর্শন নিউজ টুইট করে, পুরোহিত যদিও সম্পূর্ণ একাই মন্দিরে ছিলেন, তবুও পুলিশ তাঁকে মারধর করা হয়—এটা বোঝাতে যে পুরোহিতটি লকডাউনের কোনও নিয়ম ভাঙেননি। পোস্টটিতে একটা সাম্প্রদায়িক মোচড় দিতেই বলা হয়, জেলার পুলিশ সুপারের নাম আবিদ খান।

পুরোহিত মন্দিরে সম্পূর্ণ একা ছিলেন বা সেখানে কোনও ভিড় ছিল না, এই দাবি নস্যাৎ করে মধ্যপ্রদেশের জনসংযোগ দফতর এক টুইটে জানায়। "লকডাউন সত্ত্বেও জনতা মন্দিরে ভিড় জমিয়েছিল বলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।" হিন্দিতে লেখা ওই টুইটে দফতর জানায়, "যে-পুলিশ অফিসার পদক্ষেপ করেন, তাঁর নাম রাজকুমার মিশ্র এবং যে-অফিসারকে ছবিতে দেখানো হয়েছে, তিনি মোটেই এসপি আবিদ খান নন। মিশ্রর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।"

রেওয়া রেঞ্জের ইনস্পেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের সরকারি ফেসবুক পেজেও ঘটনাটি বিশদে বিবৃত করে জানানো হয়েছে, অফিসার রাজকুমার মিশ্রকে ওই ঘটনার পর তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর জায়গায় স্টেশন হাউস অফিসারের পদে নিয়োগ করা হয়েছে শিবপূজন সিং বিষেণকে।

আবিদ খান বুমকে জানান, সোশাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক রঙ চড়িয়ে পোস্ট শেয়ার হওয়ার আগেই দায়ী অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়। "মন্দিরের পুরোহিতকে আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যাতে মন্দিরে কোনও ভিড় না হয় এবং যেহেতু পুরোহিত নিজেও একজন সরকারি কর্মচারী, তাই লকডাউনের নিয়মকানুনও তাঁর সম্যক জানা থাকার কথা। তা সত্ত্বেও তিনি পুজোর বন্দোবস্ত করেন এবং তা দেখতে ভিড়ও জমে যায়।" ঘটনার পরেই অবশ্য পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং পুরোহিতও থানায় এসে লকডাউন ভাঙার জন্য ক্ষমা চেয়ে যান।

"রেওয়া-র লোকজন সরকারি তদন্ত শুরু হওয়ার পর ঘটনাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। কিন্তু সহসা ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে পোস্ট শেয়ার হতে লাগল যে আমিই নাকি ওই পুরোহিতকে মারধর করেছি এবং পুরোহিত নাকি সে সময় মন্দিরে একাই ছিলেন! আমাদের গোটা পুলিশ বাহিনী এবং শহরের নাগরিকরাও অবশ্য বুঝে গেলেন কীভাবে ভুয়ো খবর প্রকৃত ঘটনার চেয়েও দ্রুত গতিতে সফর করে।"

আইন ভাঙার জন্য পুরোহিতের বিরুদ্ধে কোনও মামলা দায়ের হয়েছে কিনা জানতে চাইলে খান বলেন— "না, আমরা তেমন কিছু করিনি। বস্তুত ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে আমরা এই সব ক্ষেত্রে কোনও অভিযোগ দায়ের করিনা, কেবল তাঁদের বোঝাই, এ ভাবে ভিড় হতে দেওয়াটা কতটা বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকর। ওই পুরোহিতের বেলাতেও সেটাই করা হয়েছে।"

Updated On: 2020-04-09T13:58:27+05:30
Claim Review :  রেওয়ার এসপি আবিদ খান একাকী প্রর্থনা করা মন্দিরের পুরোহিতকে মেরেছে
Claimed By :  Sudarshan News & Facebook posts
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story