বেতের মার খাওয়া সম্পর্কহীন ব্যক্তিকে ভগৎ সিং বলা হল

বুম দেখে ভগৎ সিংয়ের মাত্র চারটি আর্কাইভ ছবি আছে, ভাইরাল ছবিটি তার মধ্যে নেই।

উর্দি-পরা পুলিশ একজনকে বেত্রাঘাত করছে – এমনই এক সাদা-কালো ছবি এই বলে ভাইরাল হয়েছে যে, স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিংকে চাবুক মারছে এক ইংরেজ পুলিশ অফিসার।

বুম দেখে, ১৯১৯ সালের ওই ছবিতে ভগৎ সিংকে দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া, ভগৎ সিংয়ের ওপরে লেখা বেশ কিছু বই থেকে জানা যায় যে, ওই বিপ্লবীর ছেলেবেলা থেকে বন্দি হওয়া পর্যন্ত, তাঁর মাত্র চারটি ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। এবং ভাইরাল ছবিটি সেগুলির একটিও নয়।
বিপ্লবী ভগৎ সিং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে ছিলেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পঞ্জাব প্রদেশের লয়ালপুর জেলায় ১৯০৭ সালে ভগৎ সিংয়ের জন্ম। ২৯ মে ১৯২৭ সালে, বছর খানেক ধরে চলতে-থাকা দশেরা বোমা মামলায় উনি প্রথম বার গ্রেফতার হন। পাঁচ সপ্তাহ পুলিশি হেফাজতে থাকার পর, ৪ জুলাই ১৯২৭-এ জামিনে মুক্তি পান ভগৎ সিং।
পরে ৪ এপ্রিল, ১৯২৯, দিল্লিতে ভগৎ সিং ও বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত সেই সময়কার সেন্ট্রাল অ্যাসেমব্লির (যা আজকের ভারতীয় সংসদ) দর্শকের গ্যালারি থেকে লিফলেট ছড়ান এবং বোমা ছোঁড়েন। কয়েক মাস ধরে বিচার চলার পর, ৭ অক্টোবর ১৯৩০-এ, ভগৎ সিং, শিবরাম রাজগুরু ও সুখদেব থাপারের ফাঁসির আদেশ হয়।
২৭ অক্টোবর তাঁদের ফাঁসির দিন নির্ধারিত হয়। কিন্তু ভগৎ সিং ওই রায়ের বিরুদ্ধে প্রিভি কাউনসিলে আবেদন করেন। সেখানে শুনানির শেষে, ফেব্রুয়ারি ১৯৩১-এ তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে গেলে, ২৩ মার্চ ১৯৩১-এ ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেব, এই তিন বিপ্লবীর ফাঁসি হয়ে যায়।
ভাইরাল ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি লোকের দু'টি হাত দু'টি পোস্টের সঙ্গে বাঁধা। তার শরীরের নীচের দিকের পোশাক নামানো। ফলে তার পাছা দেখা যাচ্ছে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে এক উর্দি-পরা পুলিশ। ছবিটির এক পাশে ছোট করে ইনসেটে দেওয়া হয়েছে একটি খবরের কাগজের ক্লিপ। সেটিতেও ওই একই ছবি দেখা যাচ্ছে।
ভাইরাল পোস্টটির সঙ্গে হিন্দিতে লেখা একটি লম্বা ক্যাপশন রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, "দ্বিতীয় কোনও ভগৎ সিং যাতে না তৈরি হয়, তার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিংকে বেত্রঘাত করার ছবি ছাপা হয় খবরের কাগজে। যে সময় ভগৎ সিং ও অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভারতের মুক্তির জন্য লড়াই করছিলেন, তখন ব্যারিস্টার হওয়া সত্ত্বেও, আম্বেদকার, গাঁধী ও নেহরু তাঁদের জন্য কিছুই করেননি। ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের সুবাদে, তাঁরা বেশ সুখ সাচ্ছন্দে ছিলেন। আর অন্যদিকে, বিপ্লবীদের জেলে পোরা হয়েছিল। এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁদের অনেকে মৃত্যু বরণ করতেও পিছপা হননি। তবুও গাঁধী, আম্বেদকার ও নেহরুকে লোকে মহান মনে করে।"
(হিন্দিতে লেখা ক্যাপশন: आजादी के लिए कोड़े खाते भगत सिंह जी की तस्वीर उस समय के अखबार में छपी थी ताकि और कोई भगत सिंह ना बने भारत में........जिस समय भगत सिंह सहित सभी क्रांतिकारी आज़ादी के लिए लङ रहे थे वही अम्बेडकर,गाँधी और नेहरू जैसे लोग बैरिस्टर होते हुये भी क्रांतिकारीयो के लिय कुछ नही किया।अंग्रेजों के चाटुकार बनकर सुख-सुविधा से जी रहे थे। क्रांतिकारीयो ने जेल काटी, दर्द सहा यहाँ तक की फांसी चढ गए देश के लोगों के खातिर लेकिन लोगो को आज भी महान गाँधी,अम्बेडकर और नेहरू को बताया जाता है)
পোস্টটি নীচে দেখুন; আর্কাইভ করা আছে
এখানে
একই দাবি সহ ছবিটি টুইটার ও ফেসবুকেও ভাইরাল হয়েছে।

তথ্য যাচাই

বুম ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে, ২০১৯-এ 'বাইলাইন টাইমস'-এ প্রকাশিত একটি লেখা নজরে আসে। তাতে ওই একই ছবি ছাপা হয়। এবং সেটির ক্যাপশনে বলা হয়, 'অমৃতসরের হত্যাকাণ্ডের পর, ভারতীয়দের বেত্রাঘাত করা হয়।'

লেখাটিতে অমৃতসর হত্যাকাণ্ড বলতে জালিয়ানওয়ালা বাগের ঘটনার কথাই বলা হয়। ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ তারিখে, পাঞ্জাবের অমৃতসরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। অস্থায়ী ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল রেজিনল্ড ডায়ার সে দিন ইংরেজ সেনা বাহিনীর ভারতীয় সেপাইদের নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানর নির্দেশ দেন। বৈশাখী উৎসব উপলক্ষে বহু মানুষ সেদিন অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালা বাগে সমবেত হয়ে ছিলেন।

এর পর, 'ইন্ডিয়ানস', 'ফ্লগড', 'অমৃতসর', '১৯১৯' ও 'ম্যাসাকার' – এই কি-ওয়ার্ডগুলি দিয়ে সার্চ করা হয়। তার ফলে আরও কিছু লেখা বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, সেগুলিতেও ওই একই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

১৭ এপ্রিল ২০১৯-এ, জালিয়ানওয়ালা বাগের শহিদদের স্মরণে 'দ্য ক্ল্যারিয়ন'-এ প্রকাশিত লেখাতেও ওই একই ছবি ব্যবহার করা হয়। সেটির ক্যাপশনে বলা হয়, '১৯১৯-এ সাবেক পঞ্জাবে বেত্রাঘাতের দৃশ্য'।

'সবরঙ ইন্ডিয়া' ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি লেখায় ওই একই ছবি একই ক্যাপশন সহ ব্যবহার করা হয়।

ওই ক্যাপশনগুলির ভিত্তিতে যদি আমরা ধরে নিই যে, ছবিটি ১৯১৯ সালের, তাহলে দেখা যাচ্ছে সেই সময় ভগৎ সিংয়ের বয়স ছিল ১২ বছর।

এর পর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর চমন লাল-এর সম্পাদিত বই 'ভগৎ সিং রিডার' পড়ে দেখি আমরা। 'ভগৎ সিং আর্কাইভ অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার, দিল্লি আর্কাইভস'এর সাম্মানিক পরামর্শদাতাও প্রফেসর চমন লাল।

ওই বইটি বেশ বৃহৎ আকারের। তাতে সংগৃহীত আছে ভগৎ সিংয়ের সমস্ত লেখা, যার মধ্যে পড়ে তাঁর চিঠি, টেলিগ্রাম, নানা নোটিস ও তাঁর জেলে বসে লেখা নোটবই।

ওই বইতে রয়েছে ভগৎ সিংয়ের চারটি ছবি। এবং তাতে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, ওই তরুণ বিপ্লবীর মাত্র ওই চারটি ছবিই পাওয়া যায়।

ছবিগুলি নীচে দেখুন।

স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিংয়ের ওই চারটি ছবিই সবচেয়ে বেশি শেয়ার করা হয়।

ভাইরাল ছবিতে যে ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে, তাঁকে স্বাধীনভাবে বুম সনাক্ত করতে পারেনি।

Updated On: 2020-10-25T18:34:20+05:30
Claim Review :   ছবিতে দেখা যায় ব্রিটিশ পুলিশ ভগৎ সিংকে বেত্রাঘাত করছে
Claimed By :  Social Media
Fact Check :  False
Show Full Article
Next Story