রাহুল গান্ধী-সহ (Rahil Gandhi) কংগ্রেসের একাধিক নেতা ট্রেনে এক ব্যক্তির হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ভিডিও শেয়ার করে দাবি করেন, ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ওই রেলযাত্রীর। পাশাপাশি, ঘটনাটিকে ১৩ জুন বিহারের পাটলিপুত্র জংশনে (Patliputra Junction) ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা ও বিক্ষোভের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
বুম যাচাই করে দেখে, ঘটনাটি ঘটেছিল বিবেক এক্সপ্রেসে। মাদকাসক্তি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ইনজেকশন না পাওয়ার কারণে এক ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ অসুস্থ হয়ে পড়েন সেখানে। ভিডিওটি রেকর্ডকারী অসমের বাসিন্দা মুবারক হুসেন বুমকে জানান, ১১ জুন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম রেলস্টেশনের কাছে বিবেক এক্সপ্রেসে তিনি ভিডিওটি রেকর্ড করেছিলেন।
গত ১৩ জুন রাতে বিহার পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা পাটলিপুত্র জংশনে বিক্ষোভ করেন। ১৪ জুনের পরীক্ষার আগে ট্রেনের সংকট ও বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিক্ষোভকারীরা রেললাইন অবরোধ করেন এবং ট্রেন চলাচলও আটকে দেন। পরে নিরাপত্তারক্ষীরা লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে।
ভাইরাল দাবি
ভিডিওটি পোস্ট করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, "দুটি ভারত: অভিজাতদের জন্য বন্দে ভারত, আর বাকিদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি ও মৃত্যু। শাসনব্যবস্থা, চাকরি ও মৌলিক পরিকাঠামোর পরিবর্তে ধর্ম, মন্দির ও মেরুকরণের জন্য ভোট দিলে এটাই ঘটে। বিহার পরীক্ষার দিনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে পাটলিপুত্র স্টেশনে একটি ঠাসাঠাসি, দমবন্ধ করা জেনারেল ট্রেনের ভেতরে এক তরুণ এক্সাম ক্যানডিডেটের যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। হাতে গোনা কয়েকটি পদের জন্য ১৬ লক্ষেরও বেশি মরিয়া যুবকের লড়াই। অতিরিক্ত ভিড়। বিলম্ব। কোনো ব্যবস্থা নেই। ফল? রেললাইনের ওপর একটি ধাতব কফিন, যেখানে মানুষ শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।"
বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও একই দাবিতে শেয়ার করেন ভিডিওটি।
কী পেলাম আমরা অনুসন্ধানে: ভিডিওটি অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম স্টেশনের কাছে তোলা
১. ভিডিওর সূত্র মিলল আসামের এক বাসিন্দার কাছে: সম্পর্কিত কীওয়ার্ড অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমরা ভিডিওটির উৎস খুঁজে পাই। ভিডিওটি অসমের গুয়াহাটি-নিবাসী মুবারক হুসেনের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেখতে পাওয়া যায়। ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করেন, মাদক-সংক্রান্ত একটি ইনজেকশন সংগ্রহ করতে না পাড়ার কারণে আদিবাসী এক ব্যক্তি ট্রেনে মারা গিয়েছিলেন। পোস্টটিতে #VivekExpress হ্যাশট্যাগের ব্যবহারও দেখতে পাওয়া যায়।
১৪ জুন ওই একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়, যেখানে দাবি করা হয়, ওই ব্যক্তির মৃত্যুর আগেই ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল। ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়, কেরলগামী একটি ট্রেনে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল।
এর আগেও হুসেন একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন, যেখানে এক ব্যক্তিকে দুটি ট্রেনের বার্থের মাঝখানে চাদর বেঁধে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। ভাইরাল ভিডিওতেও একই ব্যক্তিকে দেখা যায়।
২. ভিডিওগ্রাহকের বক্তব্য: আমরা মুবারক হুসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, গুয়াহাটি থেকে কেরলের এর্নাকুলাম যাওয়ার পথে বিবেক এক্সপ্রেসে মোবাইল ফোনে তিনি ভিডিওটি রেকর্ড করেছিলেন।
মুবারক বুমকে জানান, “১১ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম রেলস্টেশনের কাছে ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল। আমার উল্টোদিকের উপরের বার্থে বসে থাকা একজন আদিবাসী ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাত্রীরা তাঁর গায়ে জল ছিটিয়ে দিয়ে তাকে নিচের বার্থেও নামিয়ে আনেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান।”
হুসেনের দাবি, ওই ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের মালদা শহর থেকে এক বন্ধুর সাথে ট্রেনে উঠেছিলেন। তার বন্ধু জানান, মৃত ওই ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং আসক্তির জন্য ব্যবহৃত ইনজেকশন না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল।
কেরলের আলাপ্পুঝার এক গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্রে কর্মরত হুসেন বলেন, সাধারণ বগিতে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় কোনো চিকিৎসকের পক্ষে দ্রুত ওই যাত্রীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরে মৃতদেহটি তার বন্ধু এবং অন্যান্য যাত্রীরা নিয়ে যান।
হুসেন ভিডিওটির মূল কপিও শেয়ার করেন, যেখানে ধারণস্থল, তারিখ এবং সময়-সংক্রান্ত মেটাডেটা ছিল।
৩. বিবেক এক্সপ্রেসের রুট কী বলছে: ডিব্রুগড় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত চলাচলকারী বিবেক এক্সপ্রেস (২২৫০৪)-এর রুট অনুযায়ী, বিহারে ট্রেনটি কেবল কিশনগঞ্জ স্টেশনেই থামে। আরও যাচাই করতে আমরা ট্রেনটির অন্ধ্রপ্রদেশ অংশের রুটে থাকা পালাসা, শ্রীকাকুলাম, বিজয়নগরম ও বিশাখাপত্তনম রেলওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তবে ১১ জুন কোনও যাত্রীর মৃত্যুর নথি তারা খুঁজে পায়নি। দক্ষিণ উপকূল রেলের (South Coast Railway) সিপিআরও বালাজি কিরণ জানান, “১১ জুন বিশাখাপত্তনম ও বিজয়ওয়াড়া ডিভিশনের কোথাও বিবেক এক্সপ্রেসের কোনও যাত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।”
এতে নিশ্চিত হওয়া যায়, ভাইরাল ভিডিওটি বিহারের নয়। তবে ভিডিওতে দেখতে পাওয়া যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল কিনা তা বুমের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৪. ভাইরাল দাবি খণ্ডন পূর্ব-মধ্য রেলওয়েরও: ইস্ট-সেন্ট্রাল রেলওয়ে তথা পূর্ব মধ্য রেলওয়েও সমাজমাধ্যম এক্স-এ এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, ভাইরাল ভিডিওটি পাটলিপুত্র স্টেশনের নয়। রাহুল গান্ধীর পোস্টের জবাবে রেলওয়ে জোনটি জানায়, “ঘটনাটি পাটলিপুত্র স্টেশনের নয়। এছাড়া কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়ে কোনও উৎস থেকে আমাদের কাছে কোনও তথ্যও আসেনি।”
(অতিরিক্ত রিপোর্টিং: জাগৃতি তৃষা)






