পাহাড়ি রাস্তায় বিপুল সংখ্যক মানুষ দৌড়াদৌড়ি করার এক ভিডিও সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে শেয়ার করে দাবি করা হয় ভিডিওটিতে নিরাপত্তার সন্ধানে হাজার হাজার মানুষের ইরানের (Iran) রাজধানী তেহরান (Tehran) থেকে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখ যায়।
বুম দেখেছে ভিডিওটি ইরানের রাজধানী তেহরানের নয়, বরং নেপালের। বুমকে ভিডিওটির নির্মাতা প্রদীপ শাহী নিশ্চিত করে জানান, তিনি নেপালের ডোলপা জেলার রূপ পাটান এলাকায় দৃশ্যটি রেকর্ড করেছেন।
বর্তমানে ইরানে রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অসন্তোষ একসঙ্গে তীব্র হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন ইরানের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভাইরাল দাবি
ফেসবুকে ভিডিওটি পোস্ট করে এক ব্যবহারকারী ক্যাপশনে লেখেন, "জানা গেছে, ইসলামিক শাসনের অধীনে প্রাণের ভয়ে হাজার হাজার ইরানি তেহরান ছেড়ে পালাচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই খ্রিস্টান। অনুগ্রহ করে ইরানে থাকা আপনাদের পরিবার ও প্রিয়জনদের জন্য প্রার্থনা করতে ভুলবেন না।"
পোস্টটি দেখতে ক্লিক করুন এখানে ও তার আর্কাইভ দেখতে এখানে।
অনুসন্ধানে আমরা কী পেলাম: ভিডিওটি নেপালের, ইরানের নয়
১. ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি পুরনো: আমরা ভিডিওর পটভূমিতে মানুষজনকে নেপালি ভাষায় কথা বলতে শুনতে পাই যা থেকে আমাদের সন্দেহ হয় যে ভিডিওটি নিয়ে ভুয়ো দাবি করা হচ্ছে। . ভিডিওটির কীফ্রেমকে রিভার্স সার্চ করে আমরা দেখতে পাই, ভিডিওটি ১ জুন ২০২৫ তারিখে ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স অ্যাকাউন্টে আপলোড করা হয়েছিল। অ্যাকাউন্টটির নাম ‘রুটিন অফ নেপাল বান্দা’, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভিডিওটি পুরনো এবং ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। নেপালি ও ইংরেজি ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ভিডিওটি নেপালের ডোলপা জেলায় তোলা, যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ রূপ পাটানের ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের জন্য জড়ো হয়েছিল।
২. ইয়ারসাগুম্বা ছত্রাক সংগ্রহ করতে যায় লোকেরা: ‘মেড ইন নেপাল’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ২ জুন ২০২৫ তারিখে ভিডিওটি শেয়ার করে জানায় যে প্রতি বছর রূপ পাটানসহ দোলপার অনেক উঁচু অঞ্চলে ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের জন্য প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। ইয়ারসাগুম্বা একটি বিরল এবং মূল্যবান ঔষধি ছত্রাক।
এই তথ্য অনুযায়ী, ‘হিমালয়ান গোল্ড’ নামে পরিচিত ইয়ারসাগুম্বা ৩০০০ থেকে ৫০০০ মিটার উচ্চতায় জন্মায়। দোলপা এবং আশপাশের জেলা রুকুম, জাজারকোট ও জুমলা থেকে মানুষ এই উঁচু পাহাড়ি তৃণভূমিতে কষ্টসাধ্য যাত্রা করে এবং সেখানে কিছু সময়ের জন্য শিবির স্থাপন করে। ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত আয়ে অনেক পরিবার সারা বছর নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে।
৩. ভিডিওটি তৈরি করেছেন নেপালের প্রদীপ শাহি: এই পোস্টগুলিতে ভিডিওটি ‘নেদো সোচ/ নেদো যাত্রী’ নামের একটি টিকটক অ্যাকাউন্টের খোঁজ পাওয়া যায়। অনুসন্ধান করার পরে আমরা এই ভিডিওটি টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ‘নেদো সোচ’ বা ‘নেদো যাত্রী’-তেও পাই, যেখানে ভিডিওটি ২৯ ও ৩০ মে ২০২৫ তারিখে আপলোড করা হয়েছিল। এর সঙ্গে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ ছিল যে ভিডিওটি নেপালের ডোলপায় ইয়ারসাগুম্বা ছত্রাক সংগ্রহের সময় তোলা।
নেদো যাত্রী সোচের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলেও এ ধরনের অনেক ভিডিও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভিডিও ও ভ্লগ অনুযায়ী, পাটানের ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের সময় দোলপা এলাকায় এভাবেই ভিড় জমায়। সম্পর্কিত ভিডিওগুলি এখানে, এখানে এবং এখানে দেখা যেতে পারে।
নেদো যাত্রী সোচের ইনস্টাগ্রামে থাকা তথ্য অনুযায়ী, এই পেজটি পরিচালনা করেন প্রদীপ শাহী ঠাকুরি, যিনি নেপালের ডোলপা জেলার বাসিন্দা। নিশ্চিতকরণের জন্য আমরা প্রদীপের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বুমকে জানান যে ভিডিওটি তিনি নিজেই রেকর্ড করেছেন। ভিডিওটি নেপালি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০৮২-০২-১৩, অর্থাৎ ২৭ মে ২০২৫ তারিখে তার গ্রামের কাছাকাছি ডোলপা শহরের রূপ পাটানে রেকর্ড করেছিলেন, যখন মানুষ ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের জন্য যাচ্ছিল।
কাঠমান্ডু পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারনালি প্রদেশের প্রত্যন্ত পার্বত্য জেলা ডোলপায় ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের মরসুম শুরু হলে বিদ্যালয়গুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এমনকি শিক্ষকরাও এই মূল্যবান ভেষজ সংগ্রহের জন্য উঁচু পাহাড়ি তৃণভূমিতে চলে যান।






